এক বংশ আসে, আগের বংশ বিদায় নেয়। এক প্রজন্ম গেলে আসে আরও এক প্রজন্ম। এই হল সংসারের নিয়ম। এভাবেই এক সাইকেলের মত চলে আসছে পৃথিবী। সেভাবেই বলিউডে ধুলোয় মিশছে খানদের জায়গা। তাঁদের নাম। শাহরুখ খান, আমির খান, সলমন খান যাদের ছবির জন্য এক সপ্তাহ আগে থেকে চলত অনলাইন এবং অফলাইন টিকিট বুকিং। তাঁদের ছবির গল্প নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যাথা নেই, তিন খানের ছবি মুক্তি মানেই চোখ-নাক-কান বন্ধ করে চল তাঁদের ছবি দেখতে। আশির দশকের শেষের দিকে আবির্ভাব হল বলিউডের চকোলেট বয় আমির খানের। তাঁকে দেখেই নিমেষের মধ্যে তৈরি হয় মহিলা ভক্তদের এক দল। অন্যদিকে সলমনের শার্টলেস অবতারে মেয়েদের প্রায় ঘাম ঝড়ার জোগার। অন্যদিকে রোম্যান্স কিং শাহরুখ খানের বাঁকা হাসিতে ব্লাশ করে না এমন মেয়ে খুব কমই আছে। প্রায় দু'ই দশকেরও বেশি, বলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে ধরে রেখে দিয়েছিলেন নিজেদের কাঁধে। হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের অর্থনৈতিক অবস্থাও বদলে দিয়েছিলেন রাতারাতি। একদিন এঁদের সাম্রাজ্যের যে পতন হবে তা কেউই কখনও ভাবেননি। 

 

 

খান সাম্রাজ্য
বছরে একটা করে ছবি আর তাতেই কোটি কোটি টাকার আয় বক্স অফিসে। সেই ছবির গল্পের কোনও মাথা মুন্ডু যে থাকতেই হবে এমন কোনও কথা নেই। যদিও এক সময় রীতিমত ভাল, পাওয়ার প্যাকড স্টোরিলাইন, অভিনয়ের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনজনেই। তবুও একটা সময়ের পর ছবির প্রতি তাঁদের মানসিকতা বদলায়। বদলাতে থাকে তাঁদের দর্শকমহল। প্রথমদিকে যে ধরণের দর্শক তাঁদের ছবি দেখতেন তাও বদলালো ধীরে ধীরে। স্বদেশ, দিল সে, সারফারোশ, হাম দিল ছুকে সনম, খামোশির মত ছবি উপহার দিয়েছেন শাহরুখ, আমির এবং সলমন। সেই সময় নিজেদের সমসাময়িক অভিনেতাদের দাঁড়াতেই দেননি এই প্রতিযোগিতায়। অজয় দেবগণ, সই আলি খান, বব দেওল, সহ অনেকে এসেছেন তবুও তাঁদের মত জনপ্রিয়তা লাভ তাঁরা করেননি। 

খান-দের সেরা উপহার
থিয়েটারের মঞ্চই শাহরুখের প্রথম প্রেম। সেখান থেকে হিন্দি টেলিদুনিয়ায় কাজ। তারপরই হেমা মালিনীর হাত ধরে বলিউডে বডড ব্রেক। একের পর এক ছবিতে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে টাইপকাস্ট হননি তিনি। বরং নিজের অভিনয়ের ভিন্নতা দেখাতে শুরু করলেন। একই ভাবে চকোলেট বয় আমির খানও যে কেবল মহিলাদের মন গলাতে এসেছিলেন তেমনটা নয়। বরং নিজেকে অন্যস্বাদের ছবিতে ভেঙে গড়ে নিলেন। পিছিয়ে যাননি সলমন খানও। তিনি কমবেশি বিভিন্ন ছবিতে নিজের অভিনয় দক্ষতা দেখাবার চেষ্টা করেছিলেন। 

 

 

ভোলবদল
হঠাৎই বদলে গেল তাঁদের ছবির স্বাদ। ভাল চিত্রনাট্য ছেড়ে মন একজন মন দিলেন ননসেনসিক্যাল ছবিতে। তিনি হলেন সলমন খান। টিউবলাইট, দাবাং ফ্র্যাঞ্চাইজি, ওয়ান্টেড, সুলতান, রেস থ্রি। একটি ছবিরও চিত্রনাট্য পেশ করারও যোগ্য নয়। বক্স অফিসে কামাল দেখালেও দর্শকরা বুঝতে শেখে কোয়্যালিটি এবং কোয়ান্টিটির পার্থক্য। শাহরুখ নিজেকে ভাঙা গড়া বন্ধ করে মন দিলেন নিজের স্টিরিওটিপিকাল চিত্রনাট্য। যেখানে ৫০ পা দিয়েও তাঁর নায়িকার বয়স রয়েছে ২৫ থেকে ৩০। এটি অবশ্য সকল খানের চুক্তিবদ্ধ হিসাব। বয়স যতই হোক না কেন, নায়কের রোলই করে যাবেন। অন্যদিকে আমির খানও শুরু করলেন ঠাগস অফ হিন্দোস্তান, ধুম থ্রি-র মত মিডিওকারের থেকেও খারাপ ছবির পরিবেশন করা। 

খান-দানের অঃপতন
ধীরে ধীরে বদলাতেল শুরু করল তাঁদের হিসাব। গঁতে বাঁধা চিত্রনাট্য ভুলে দর্শক পেরিয়ে গেল খান সাম্রাজ্যকে। ধীরে ধীরে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকল রাজকুমার রাও, ভিকি কৌশল, আয়ুষ্মান খুরানা। ছিলেন তাঁরা বহু আগে থেকেই, তবে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারেন দর্শকের স্টিরিটিপিকাল স্বাদের কারণে। ২০১৮ সালের শেষের দিক থেকে বদলাতে থাকল দর্শকের চিন্তা ধারা। হল স্বাদবদল। দর্শকতিন খানকে পিছনে রেখে বেছে নিল রাও, কৌশল, খুরানা, সিংদের। এরই মাঝে উঠে দাঁড়ালেন অক্ষয় কুমার। যে চাহিদা তাঁর নব্বইয়ের দশকে ছিল না। তা উঠে এল এখন। 

 

 

ভিন্নতায় ফিরে দেখা
সলমন খান না হলেও আমির খান এবং শাহরুখ খান এবার চেষ্টা করছেন ভিন্নতায় ফেরার। নিজেদের নব্বই দশকের পুরনো ছবির গল্পের মতই ঘেষ মেজে দেখার চেষ্টা করছেন নিজেদের প্রতিভাকে। তবে বারে বারে ব্যর্থতার খাতায় নাম উঠেছে তাঁদের। যব হ্যারি মেট সেজাল, জিরো, রাইজ, ছবিতে শাহরুখের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলা যায়নি। এমনকি ক্রিটিকালি অ্যাক্লেমড ছবি ফ্যানেও তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকমহলকে। তবে বক্স অফিসে কামাল দেখাতে পারলেন না তিনি। এখনও চেষ্টা করে চলেছেন নতুন ধরণের ছবিতে কাজ করার। ইমতিয়াজ আলি, আনন্দ এল রাইয়ের মত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেও কোনও লাভ তেমন হয়নি। তেমনই লম্বা ব্রেক নিয়ে লাল সিং চাড্ডায় ভিন্নতা আনার আশায় রয়েছেন আমিরও। খান সাম্রাজ্যের যে অধঃপতন হয়েছে তা আর বলারক অপেক্ষা রাখে না। পঙ্কজ ত্রিপাঠি, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির মতই তাঁরা কি নিজেদের স্টারডম ছেড়ে ফের শিখরে উঠতে পারবেন। সময়ই দেবে এর উত্তর।