২০১৩ সালেই সুপ্রিম কোর্ট, ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ব্যালটে 'নোটা' বা 'নান অব দ্য অ্যাবাভ' অর্থাত 'উপরের কাউকেই নয়' বিকল্প রাখার অনুমতি দিয়েছে। তারপর থেকে ভারতে কিন্তু ক্রমে নোটার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তবে ভোটের সময় নিজেদের স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলি নোটা ভোটের কোনও ক্ষমতাই নেই বলে প্রচার করে থাকে। অনেক ভোটারও মনে করেন পছন্দের প্রার্থী না থাকলেও নোটা-তে ভোট দেওয়া মানে ভোটটা নষ্ট করা।

কিন্তু নোটা ভোট কিন্তু মোটেই এতটা দুর্বল নয়। বিশ্বের ইতিহাসে নোটা ভোট বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। অনেকেরই জানা নেই পোলান্ডে সরকার ফেলে দিয়েছিল নোটা ভোট। রাশিয়ায় অবসান ঘটিয়েছিল কমিউনিস্ট শাসনের। চলতি নির্বাচনের মরসুমে জেনে নেওয়া যাক নোটা ভোটের ইতিহাস। দেখে নেওয়া যাক নোটার শক্তি।


কোন কোন দেশে রয়েছে নোটা ভোট?

ভারত, গ্রীস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা প্রদেশ, কানাডা, নরওয়ে, ইউক্রেন, বেলারুশ, স্পেন, উত্তর কোরিয়া, কলম্বিয়া, বাংলাদেশ বুলগেরিয়া-সহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশেই কিন্তু নোটা ভোট চালু রয়েছে। রাশিয়ায় ২০০৬ সালে এই বিকল্প তুলে দেওয়া হয়। পাকিস্তানে ২০১৩ সালে নোটা ভোট চালু করেও পরে তা বাতিল করা হয়।


বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পদ্ধতিতে

গ্রীস, স্পেন, কলম্বিয়ায় নোটা পরিচিত 'হোয়াইট ভোট' নামে, আর্জেন্টিনায় বলা হয় ব্ল্যাঙ্ক ভোট, ইউক্রেনে বলা হয় 'এগেন্সট অল'। এইরকমভাবে বেশ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন নামে ও বিভিন্নভাবে নোটা ভোট গ্রহণ করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কাউকেই না বাছার অধিকার সুরক্ষিত করা। আর্জেন্টিনায় যেমন ফাঁকা ব্যালট জমা দেওয়াকেই 'ব্ল্যাঙ্ক ভোট' হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। আবার নরওয়েতে নির্বাচনে প্রত্য়েক ভোটারকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি ফাঁকা ব্যালট দেওয়া হয় নোটায় মতদানের জন্য। কানাডায় আছে বুথে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট না দেওয়ার অধিকার প্রকাশের ব্যবস্থা।


নোটা পার্টি, নোটা প্রার্থী

আবার ব্রিটেন বা সার্বিয়া মতো অনেক জায়গায় নোটা বিকল্প না থাকলেও, সেইসব দেশের কখনও কখনও নোটার নামে দলই গড়ে ফেলা হয়েছে। সার্বিয়ায় ২০১০ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে 'নান অব দ্য অ্য়াবাভ' নামে একটি রাজনৈতিক দলই গঠন করা হয়। একই ভাবে ব্রিটেনে 'নো ক্যান্ডিডেটস ডিসার্ভ মাই ভোট পার্টি', 'নোটা পার্টি' নামেও ভোটে লড়া হয়েছে, যাদের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে নোটার অধিকারকে সুরক্ষিত করা। একই লক্ষ্যে নিজের নাম পরিবর্তন করে 'নান অব অ্য়াবাভ জিরো' বা 'নান অব দ্য অ্যাবাভ এক্স' নামে নির্বাচনে লড়ার নিদর্শনও রয়েছে।


নোটার ক্ষমতা

সার্বিয়ায় ২০১২ সালে নির্বাচনে লড়ে ২২,৯০৫টি ভোট পেয়ে সার্বিয়ান পার্লামেন্টে একটি আসন দখল করেছিল 'নান অব দ্য অ্য়াবাভ' পার্টি। ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার  শহরে মেয় নির্বাচনে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীই ছিলেন। প্রতিপক্ষ ছিল 'কোটাক কোসোং (ফাঁকা বাক্স)' বা নোটা। ৩৫০০০ ভোটে জিতে যায় নোটা। ফলে ২০২০-তে পুনর্নির্বাচন হবে। এরকম বিশ্বের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বহু জায়গায় নোটা ভোট-কে কেন্দ্র করে দারুণ আকর্ষণীয় সব কাহিনি রয়েছে।

তবে নোটার শক্তি সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিভাত হয়েছিল গত শতাব্দীর আটের দশকের শেষ ও নয়ের দশকের শুরুতে পোল্যান্ড ও রাশিয়ায়। ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ডে কমিউনিস্টপন্থী পোলিশ ইউনাইটেড ওয়ার্কার্স পার্টির সরকার ছিল। অধিকাংশ জায়গাতেই শাসক দলের বিরুদ্ধে কোনও প্রার্থীই দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু, সাধারণ মানুষ ভোটের সময় ব্যালটে প্রার্থীদের নাম কেটে দিয়েছিলেন। যার ফলে সেখানে কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটেছিল।

একই ভাবে ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাধারণনির্বাচনে নোটা ভোট সেখানকার কমিউনিস্ট সরকারের ভিত নড়ড়ে করে দিয়েছিল। ২০০ টি আসনে নতুন প্রার্থী দিয়ে, নতুন করে নির্বাচন করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। আগের নির্বাচনে জয় পাওয়া কমিউনিস্ট পার্টির ১০০ জনের বেশি প্রার্থী পরাজিত হন। ১৯৯২ সালে সোভিয়েতের পতনের পর বরিস ইয়েলেতসেন বলেছিলেন নোটার বিকল্পই মানুষের হাতে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ এনে দিয়েছিল।


নোটার ফলাফল

সব দেশেই নোটা-তে মতদানের অর্থ হল বাকি কোনও প্রার্থীকেই পছন্দ না হওয়া। অর্থাত কোনও ভোটে যদি দেখা যায় নোটা বেশখি ভোট পেয়েছে সেই ক্ষেত্রে আদর্শ পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সকল প্রার্থীকেই বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন করা। কিন্তু, ভারতে নোটা ভোটকে এখনও সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। নির্বাচ কমিশনের নিয়মন অনুযায়ী কোনও কেন্দ্রে নোটা সর্বাধিক ভোট পেলেও, সেই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকেই জয়ী ঘোষণা করা হবে।


ভারতে নোটার ইতিহাস

ভারতে এখনও পর্যন্ত কোনও লোকসভা বা বিধানসভা আসনে নোটা সর্বাধিক ভোট না পেলেও যত দিন যাচ্ছে নোটার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বেশ কিছু ভোটের ক্ষেত্রে নোটা নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে। ২০১৭ সালের গুজরাত লোকসভা নির্বাচনে ১১৮টি কেন্দ্রে বিজেপি ও কংগ্রেসের পরেই ছিল নোটা। গোটা রাজ্যে বিজেপি কংগ্রেস ও নির্দল প্রার্থীদের সম্মিলিত প্রাপ্ত ভোটের পরই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল নোটা। ২০১৮ সালে কর্নাটক বিধানসভা ভোটে সিপিআইএম বসপা-এর মতো দলগুলির থেকেও বেশি ভোট ছিসল নোটার ঝুলিতে। একই বছরে মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কংগ্রেসের মোট ভোটপ্রাপ্তির ব্যবধান ছিল মাত্র ০.১ শতাংশ। সেখানে নোটা ভোট পেয়েছিল ১.৪ শতাংশ।


নোটা ভোট দিয়ে লাভ কি?

ভারতে এখনও অবধি নোটা ভোটের ক্ষমতা সীমিত। নোটা ভোট আপাতত নেতিবাচক মনোভা প্রকাশেরই মাধ্যম। এই ভোট দিয়ে একজন ভোটার সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সকল প্রার্থী বা ভোটারের উপর অনাস্থা প্রকাশ করতে পারেন। গত কয়েক বছরের নোটা ভোটের ইতিহাস দেখে রাজনৈতিক দলগুলিও নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে নোটা ভোট যদি প্রথম দুই দলের কেউ নিজেদের ঝুলিতে আনতে পারত, তাহলে ফলাফলই বদলে যেত। তাই এলাকার সমস্যা, এলাকার চাহিদা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন দলগুলি। অর্থাত সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও নোটা ভোট কে গণতান্ত্রিক শক্তির প্রয়োগে সফলভাবে ব্যবহার করা যায়। কাজেই নোটা-তে ভোট দেওয়া মানে ভোট নষ্ট - এই ধারণা একেবারেই ভুল।