ইয়ান ফ্লেমিংয়ের থ্রিলার চরিত্র জেমস বন্ড প্রথম হাজির হয়েছিলেন টেলিভিশনে, ১৯৫৪ সালে। তখন থেকেই ফ্লেমিং বন্ডকে নিয়ে সিনেমা বানানোর কথা ভাবতেন। কিন্তু কোনো প্রযোজকই বন্ডকে নিয়ে সিনেমায় আগ্রহী হন নি। শেষমেস রাজি হলেন অ্যালবার্ট ব্রোক্কোলি। কিন্তু মাঝপথে ব্রোক্কোলির পার্টনার বেঁকে বসায় বন্ড-এর কাজ থেমে গেল। অবশেষে বন্ডের প্রযোজক হলেন অ্যালবার্ট ব্রোক্কোলি এবং হ্যারি শার্ল্টজম্যান। বন্ডের প্রথম প্রযোজক জুটি তাদের প্রথম ছবির জন্য কাহিনি হিসেবে পছন্দ করলেন ‘ডক্টর নো’। এরপরই শুরু হল বন্ড-এর খোঁজ। বন্ডকে খুঁজে বের করার জন্য তারা ‘ফাইন্ড জেমস বন্ড’ নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন। ২৮ বছর বয়সী মডেল পিটার অ্যান্থনি ওই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলেন ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো, তাকে বন্ড চরিত্রে ভাল মানাচ্ছে না। 

আরও পড়ুনঃকত বড় হল ইউভান, শুভশ্রী নয়, অন্য কারও কোলে ছেলে, ছবি পোস্ট রাজের

অতএব তাঁকে বাদ দিয়ে প্রথম বন্ড হিসেবে বেছে নেওয়া হল থমাস শন কনারিকে। শন কনারি পরিবারের দারিদ্যতার কারণে এডিনবার্গে ঘুরে ঘুরে দুধ বিক্রি করতেন। এরপর ব্রিটেনের রয়েল নেভিতে যোগ দেন তিনি। তবে শারিরীক দুর্বলতার কারণে তার নেভির চাকরি চলে যায়। এরপর অনেক ধরনের কাজ করেছেন- লরি চালিয়েছেন, লাইফগার্ডের চাকরি করেছেন, দৈনিক মজুরিতে শ্রমিকের কাজও করেছিলেন শন কনারি। এক সময়ে শন কনারি এডিনবার্গ কলেজ অব আর্ট-এর মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন তার মডেলিং দেখে অনেকেই প্রশংসা করেছিলেন। ছ’ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা যুবকটি এরপর জিম শুরু করেন এবং বডি বিল্ডিংয়ে মনোযোগ দেন। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর শারীরিক গঠনে অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যে পরিবর্তন অনেককেই তাক লাগিয়ে দেয়।

আরও পড়ুনঃকীসে সবচেয়ে বেশি নেশা থাকে, উত্তর রয়েছে 'কৃষ্ণকলি'র কাছে

এরপর শন কনারি বাড়তি কিছু রোজগারের আশায় ‘কিংস থিয়েটার’-এর ব্যাকস্টেজে সহযোগী হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। বডি বিল্ডিংয়ের সুবাদে তিনি ‘সাউথ প্যাসিফিক’ মিউজিক্যালেও কাজের সুযোগ পান। ধীরে ধীরে থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর। পাশাপাশি সিনেমাতেও কিছু ছোটখাট সুযোগ জুটে যায় এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে। এইভাবে ‘লিল্যাকস ইন দ্য স্প্রিং’ ছবিটিতে তিনি একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যান। শন কনারির প্রথম উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় ‘নো রোড ব্যাক’ সিনেমায় গ্যাংস্টারের ভূমিকা। ওই বছরই বিবিসির টিভি সিরিজ ‘রিকুইম ফর অ্যা হেভিওয়েট’-এ তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়েরও সুযোগ পান।

এই রকমই আরও কিছু সিনেমার ছোট-বড় চরিত্রে অভিনয় করেই চলছিল শন কনারির। কিন্তু সেভাবে সাফল্যের মুখ তিনি দেখতে পাননি। অবশেষে সাফল্য আসে জেমস বন্ড চরিত্রে। অ্যালবার্ট ব্রোক্কোলি এবং হ্যারি শার্ল্টজম্যান ফ্লেমিঙের জেমস বন্ড নিয়ে প্রথম সিনেমা ‘ড. নো’ তৈরি করেন। সেই ছবিতে ০০৭ কোড নিয়ে জেমস বন্ড রূপে হাজির হন শন কনারি। এরপরই ঘুরে যায় তাঁর ক্যারিয়ারের মোড়। জেমস বন্ড সিরিজের মোট সাতটি ছবি- ‘ড. নো’, ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’, ‘গোল্ডফিঙ্গার’, ‘থান্ডারবল’, ‘ইউ অনলি লিভ টোয়াইস’, ‘ডায়মন্ডস আর ফরএভার’ ও ‘নেভার সে নেভার এগেইন’-এ শন কনারিকে জেমস বন্ড হিসেবে পরিচিত করে দেয় সবার কাছে। রাস্তায় বের হলে সবাই বলতো, জেমস বন্ড। কিন্তু তাতে বন্ড এতোটাই বিরক্ত হতেন যে তিনি বলতেন, এই জেমস বন্ডকে তিনি মেরে ফেলতে চান। তাঁর বন্ধুরা কেউ শন কনারির সামনে জেমস বন্ড নিয়ে কোনো আলোচনাই করতেন না। তারাও বিশ্বাস করতেন, জেমস বন্ডের চেয়েও ভালো অভিনেতা শন কনারি।

শন কনারি জেমস বন্ড চরিত্রে বিরক্তিকর অভিনয় থেকে অন্য ধারার চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করেও প্রত্যাশামতো সাফল্য পান। ‘দ্য ম্যান হু উড বি কিং’, ‘দ্য আনটাচেবল’, ‘দ্য রক’, ‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’, ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’, ‘মারনি’, ‘ফাইন্ডিং ফরেস্টার’, ‘দ্য লিগ অব এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টলম্যান’, ‘দ্য হিল’, ‘এনট্র্যাপমেন্ট’, ‘রবিন অ্যান্ড মারিয়ান’, ‘দ্য অফেন্স’, ‘দ্য উইন্ড অ্যান্ড দ্য লায়ন’, ‘ফার্স্ট নাইট’ ও ‘দ্য রাশিয়া হাউজ’ ইত্যাদি দারুণভাবে সফল। ২০০৬ তে অভিনয়কে বিদায় জানিয়ে অবশ্য ২০১২ সালে তিনি আবারও ফিরে আসেন অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘স্যার বিল্লি দ্য ভেট’-এ কণ্ঠ দেন। ১৯৮৮ সালে ‘দ্য আনটাচেবল’ ছবিতে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে পান অস্কার। তবে আলফ্রেড হিচককের সাইকো-থ্রিলার ‘মারনি’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দক্ষতা অনেকের মনে আছে।