তপন মল্লিক- সরকারিভাবে যে বছর ও দিনটি স্বাধীনতা দিবস তার ১৮ বছর আগে থেকে ২৬ জানুয়ারি দিনটিকেই এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী এবং কংগ্রেস নেতা কর্মীরা পূর্ণ স্বরাজ দিবস বা পূর্ণ স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করত। কিন্তু ঘটনা চক্রে সেই রীতির বদল ঘটে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের পর থেকে।  ১৯২৯-এর ২৩ ডিসেম্বর লাহোরে জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন শেষে ৩১ ডিসেম্বর ‘নেহরু রিপোর্ট’-এ উল্লিখিত ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস'-এর পরিবর্তে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’-র প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর আগে পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধি ব্রিটিশের সঙ্গে আপোষ নীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই কথা বলতেন। কিন্তু তিনিও সেদিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে পারেন নি। উপস্থিত অন্যান্য প্রতিনিধিদেরও অভিমত ছিল স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ স্বীকার ও সংগ্রাম না করলে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ন্যায় মিলবে না। তাই বহু তর্ক বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হয় আপস নয় ত্যাগ স্বীকার এবং সংগ্রামের মাধ্যমেই আসবে স্বাধীনতা। ব্রিটিশদের সমস্ত কূটনৈতিক চাল বানচাল করে দিতে সেদিন কংগ্রেস সনফগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল।

আরও পড়ুন- কেন ভারতীয় সংবিধানের আসল কপিটি সংরক্ষণ করা হয়েছে 'গ্যাস চেম্বারে' ...

প্রস্তাবে আরও বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকারের সুনির্দিষ্ট মনোভাবের অভাবে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ গ্রহণ না করে আইনসভাগুলির সদস্যপদ ত্যাগ করতে। সবশেষে অধিবেশনে জাতিকে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে এক ব্যাপক জাতীয় আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। প্রসঙ্গত; এই অধিবেশনে গান্ধিজির অনুরোধে কংগ্রেসের তরুণ নেতা জওহরলাল নেহরু সভাপতি নির্বাচিত হন। এর ঠিক এক বছর আগে নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু 'ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ' গঠন করেছিলেন।  নতুন বছর অর্থাৎ ১৯৩০-এর ২৬ জানুয়ারি সারা দেশজুড়ে পূর্ণস্বরাজ দিবস পালনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে পূর্ণস্বরাজ দিবস পালনের উদ্যোগ শুরু হয়ে যায়। গান্ধীজী পূর্ণ স্বরাজের জন্য শপথবাক্য লিখে পাঠান, ‘ভারতবাসীর পরিশ্রমের ফল এবং জীবন বিকাশের জন্য স্বাধীনতা অর্জন করা তাহাদের জন্মগত অধিকার। যদি কোনও সরকার জনগণকে তাদের অধিকার হইতে বঞ্চিত করে এবং তাদের উপর অত্যাচার করে তবে ওই সরকারের পরিবর্তন বা উচ্ছেদ করবার অধিকার ওই জনসাধারণের আছে। সুতরাং পূর্ণ স্বরাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আমরা আইন অমান্য আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত’।

আরও পড়ুন- দেশের ৭২ তম সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবসে Google-এর Doodle শুভেচ্ছা ...

শীত উপেক্ষা করে স্বাধীনতার সংকল্প নিয়ে হাজার হাজার কংগ্রেস সদস্য ১৯২৯ ৩১শে ডিসেম্বর রাত্রি ১২ টার সময় লাহোরের রাভী নদীর পারে দাঁড়িয়ে 'ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা' উত্তোলন করে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছিল। তখন তেরঙ্গার মাঝে গান্ধীজীর চরকাই ভারতের জাতীয় পতাকা। এরপর ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পূর্ণ স্বরাজ দিবস পালনের ডাক দেওয়া হয়। এরপর প্রতি বছর কংগ্রেস কর্মীরা দেশের সর্বত্র পূর্ণ স্বরাজ বা পূর্ণ স্বাধীনতার দিবস পালন করত। ১৯৪৭ সালের পর এই দিন স্বাভাবিক ভাবেই বদলে যায়। ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও দেশের প্রধান হিসেবে তখনও বহাল ছিলেন ষষ্ঠ জর্জ এবং গভর্ণর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন। তখনও দেশে কোনও সংবিধান ছিল না।  ১৯৪৭-এর ২৮ আগস্ট একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার জন্য ড্রাফটিং কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় ভীমরাও রামজী আম্বেদকরকে। ওই বছর ৪ নভেম্বর কমিটি একটি খসড়া সংবিধান তৈরি করে গণপরিষদে জমা দেয়। সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে প্রায় তিন বছর ধরে গণপরিষদ ওই খসড়া সংবিধান আলোচনার জন্য ১৬৬ বার অধিবেশনে বসেছিল। বহু বিতর্ক ও কিছু সংশোধনের পর ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে গণপরিষদের ৩০৮ জন সদস্য হাতে-লেখা ইংরেজি ও হিন্দি সংবিধানে স্বাক্ষর করেন। এর দু’দিন পর অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি সারা দেশব্যাপী প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়।

পৃথিবীতে সমস্ত ঘটনার পিছনে কোনও না কোনও কারন থেকেই যায়। তেমনই প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনক্ষণ বেছে নেওয়া থেকে স্বাধীনতা দিবসের জন্য ১৫ অগাস্টকে বেঁছে নেওয়ার পিছনেও কারন থাকাটাও অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ১৯৪৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় দিয়েছিল। সি.রাজাগোপালাচারি লেখেন, যদি ১৯৪৮ সালের জুন অবধি অপেক্ষা করতে হয় , তবে হস্তান্তরের জন্য কোন ক্ষমতাই থাকবে না। তখন  মাউন্টব্যাটেন সময়সীমা এগিয়ে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস করেন। এরপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭ পাশ হয়। এইভাবে হল আগস্ট মাস। আগস্টের অন্যন্য দিনকে না বেঁছে ১৫ তারিখকে বাছার কারন নিয়ে মাউন্টব্যাটেন বলেছিলেন, ‘আমি পুরো প্রক্রিয়ার অন্যতম এক ব্যক্তি,  এটা আমি দেখাতে চেয়েছিলাম। যখন তাঁরা বললেন,  আমরা দিনটি ঠিক করেছি কি না,  আমি জানতাম তাড়াতাড়ি কিছু করতে হবে। যদিও নির্দিষ্ট দিন মাথায় ছিল না। তবে ভাবনায় ছিল আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের কোনও একটা দিন। পরে ঠিক করলাম ১৫ই আগস্ট’।