স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বাধীনতাকে রক্ষার দায়িত্বও বর্তায়। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনক হল ইন্দিরা গান্ধী সরকারের জারি করা জরুরি অবস্থার সময়ে, ভারতের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম প্রাথমিকভাবে প্রতিবাদ করলেও কিছুদিন পরই নিজেদের স্বাধীনতা বিক্রি করে দিয়েছিল সরকারের কাছে। এই বিষয়ে বিশিষ্ট বিজেপি নেতা এল কে আদবানি বলেছিলেন, 'ইন্দিরা গান্ধী সংবাদমাধ্যমকে মাথানত করতে বলেছিল, তারা শুরু করেছিল হামাগুড়ি দিতে'। তবে সকলেই কি হামাগুড়ি দিয়েছিল? জরুরী অবস্থা জারির ৪৫ বছর পর ফির দেখা যাক, কী ভূমিকা নিয়েছিল সেই সময় সংবাদমাধ্যম।  

প্রথম দিকে প্রিন্ট মিডিয়া অর্থাৎ সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলি এই স্বাধীনতা খর্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। প্রতিবাদের অংশ হিসাবে অনেক সংবাদপত্রই সম্পাদকীয় অংশ ফাঁকা রেখে কাগজ ছাপা শুরু করেছিল। কেউ কেউ আবার সম্পাদকীয়র জায়গায় ছাপা শুরু করেন রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী কবিতা, মহাত্মা গান্ধীর জাতীয়তাবাদী উদ্ধৃতি। যা একসময় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়েছিল, তাই ইন্দিরা গান্ধী সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল।

তবে তা চলেছিল, অল্প কয়েকদিনই। সরকারী হুমকির মুখে পড়ে সংবাদপত্রের এইসব কৌশল শীঘ্রই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। তাদের পৃষ্ঠা ভরে উঠত শুষ্ক জাতীয় অনুষ্ঠানের বিবরণী, যার বয়ান আদতে তৈরি হত সরকারের পক্ষ থেকে। আর থাকত, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর উচ্চাভিলাষী পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর ছবি এবং চাটুকারিতা পূর্ণ প্রতিবেদন, এবং সরকারি বিজ্ঞাপন।

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি ভাষার দৈনিক 'হিন্দুস্তান টাইমস' বির্লা, একজন বিশিষ্ট ভারতীয় শিল্পপতি সরকারের সময়ে শক্তিশালী সমর্থক হয়েছিলেন। 'টাইমস অফ ইন্ডিয়া', যার পরিচালকগুলির এক তৃতীয়াংশ ছিলেন সরকারী মনোনীত প্রার্থী, শীঘ্রই তার স্বাধীনতা আত্মসমর্পণ করেছিল। আর দক্ষিণ ভারতের বড় পত্রিকা 'দ্য হিন্দু' বিচক্ষণতাকেই বীরত্ব বলে মেনে নিয়েছিল এবং সেইভাবেই কাজ করেছিল। রাজনৈতিক কার্টুনগুলি রাতারাতি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল কাগজের পাতা থেকে। ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতা করে কার্টুন প্রকাশ করার সাহস করেনি কোনও বড় কাগজ।

এমনকী খুশবন্ত সিং-এর মতো বিশিষ্ট সাংবাদিক-ও সমর্থন করেছিলেন জরুরি অবস্থা-কে। তিনি তখন 'দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া' পত্রিকার সম্পাদক। নির্লজ্জের মতো সেইসময় জরুরী অবস্থার জন্য তৈরি হওয়া দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলতার দায় চাপিয়েছিলেন বিরোধী দলগুলির উপর। লিখেছিলেন, '১৯৭৫ সালের মে মাসের মধ্যে মিসেস গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জনগণের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল এবং তা প্রায়শই হিংস্র হয়ে উঠছিল। আমি দেখেছিলাম স্লোগান দিতে দিতে যাওয়া মিছিলগুলি বোম্বাইয়ে রাস্তার ধারে রাখা গাড়ি এবং দোকানের জানালার কাচ ভেঙে দিচ্ছে। বিরোধী দলের নেতারা দেশকে বিশৃঙ্খলায় ডুবে যেতে দেখে আশা করছিলেন যে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা মিসেস গান্ধীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করবে'।

জরুরী অবস্থার পক্ষে থাকার পিছনে বিভিন্ন স্বত্বাধিকারী, কাগজ মালিক এবং সাংবাদিকদের নিজস্ব আলাদা আলাদা কারণ ছিল। যেমন, টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তাদের কাগজ জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করবে না। কারণ, এই বিষয়ে তাদের মতামত যাই হোক না কেন, তারা আইন মেনে চলবে। আর সেই সময় জরুরি অবস্থাই ছিল আইন। এই কাগজের এক বিশিষ্ট সাংবাদিক ইন্দার মালহোত্রা পরে বলেছিলেন, ' সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, আমরা এর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারব না। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কাগজ হওয়ায় আমাদের তা অনুসরণ করতে হয়েছিল। আমাদের মধ্যে কয়েকজন প্রস্তাব দিয়েছিল যে আমরা যদি এর বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারি, তবে আমরা একে সমর্থনও করব না। আর কাগজের চূড়ান্ত অবস্থানও তাই হয়েছিল'।

তবে সবাই যে হামাগুড়ি দিয়েছিল তা নয়। 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' এবং 'দ্য স্টেটসম্যান'-এর মতো পত্রিকা ইন্দিরা গান্ধীর এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে লড়েছিল। লড়েছিল 'হিম্মত'-এর মতো আরও অনেক ছোট, স্বতন্ত্র সংবাদপত্র এবং জার্নাল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। তার তিনদিন পর অর্থাৎ ২৮ জুন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর দিল্লি সংস্করণ প্রথম সম্পাদকীয় জায়গাটি ফাঁকা রেখেই পত্রিকা প্রকাশ করেছিল। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস আবার তাদের পাতায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির' কবিতাটি বড় বড় করে ছেপেছিল। জরুরী অবস্থা-র মধ্য়েই ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে ছোট পাক্ষিক নিউজম্যাগাজিনের আকারে পথ চলা শুরু হয়েছিল 'ইন্ডিয়া টুডে'র। জরুরী অবস্থা ঘোষণার পরের দুটি সংস্করণে 'হিম্মত' পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় অংশ ফাঁকা রেখে দিয়েছিল। তারপরে থেকে নির্ভিক সত্যি কথা লিখত তারা। পরে অবশ্য সরকারি নির্দেশিকা লঙ্ঘন করার অভিযোগ ওঠে।

এই হাতো গোনা রয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাহসী, একগুঁয়ে লড়াই থাকা সত্ত্বেও এটা স্পষ্ট, যে জরুরি অবস্থার সময়ে, ইন্দিরা গান্ধী যেমন ভারতীয় রাজনীতির হর্তা-কর্তা-বিধাতা হয়ে উঠেছিলেন, তেমনই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের উপরও তাঁর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি আর তাঁর পুত্র সঞ্জয় গান্ধীই ছিলেন শেষকথা।