তপন মল্লিকঃ দিল্লিতে কৃষকদের আন্দোলন আজ ৫০ দিনে পা রাখল। একটানা সাত সপ্তাহ ধরে দিল্লির হাড় কাপানো শীত উপেক্ষা করে নিজেদের দাবিতে অনড় রয়েছেন কৃষকেরা। তাপমাত্রা হু হু করে নেমে কখনও শূন্য ডিগ্রিতে, হাড় হিম হয়ে গিয়েছে, কখনো নেমেছে বৃষ্টি, তার মধ্যে দাঁতে দাঁত চেপে যারা লড়াই চালিয়ে  যাচ্ছেন, নিজেদের দাবি থেকে একচুলও না সরে পাঁচশোর বেশি কৃষক সংগঠন যে এখনও এক সুরে কথা অলছে সেই সংগ্রামকে কেওল কৃষকদের আন্দোলন বলবো? 

কেউ কেউ এমন জেদি আন্দোলনকে ‘খালিস্তানি’ ভেবেছেন, কেউ আবার ওঁদের একরোখা পন দেখে বলেছেন, পাকিস্তান কিংবা চীনের এজেন্ট, অনেকে আবার আন্দোলনে আপোষহীন মানসিকতা দেখে আরবান নকশাল, মাওবাদীদের ইন্ধন কথাটিকে দেগে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কৃষকদের প্রতিবাদে এত জেদ, তাদের আন্দোলনে এমন অটুট মেজাজ মধ্যবিত্ত মেট্রোপলিটন মন-মেধা কিছুতেই যেন মানে নিতে চাইছে না। শেষ পর্যন্ত ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাংয়ের সদস্য’ বলেও দাগিয়ে দেওয়ার সবিশেষ চেষ্টা হয়েছে।

সরকার তরফে আটবার কৃষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে, কিন্তু কোনও সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসেনি। সেটা ঘটার সম্ভবনাও ছিল অতি সামান্য। কারণ সরকার তার নিজের পাশ করানো তিন নতুন কৃষি আইন কিছুতেই প্রত্যাহার করেবে না আর সেই দাবিতেই অনড় আন্দোলনরত কৃষকেরা। সরকার কৃষকদের আপোষের পথে  আনতে বহু চেষ্টা করেছে, একাধিক প্রস্তাবও সামনে রেখেছে কিন্তু ভবি ভোলার নয়। এত কিছুর পরেও কৃষকদের একতায় এতটুকু ফাটল ধরাতে পারেনি কেন্দ্র সরকার। 

স্বাধীনতা উত্তর দেশ এমন অভূতপূর্ব আন্দোলন আরেকটা দেখেছে কিনা বলা মুশকিল। সব আন্দোলনের চরিত্র বা প্রকৃতি এক নয়। সব অন্দোলনের ধার ও ধারাবাহিকতাও এক নয়। কৃষক আন্দোলন আর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্যে মৌলিক কিছু ফারাক আছে। সেসব তত্ত্বকথার বাইরেও একথা আজ বলাই যায় যে নতুন কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে গড়ে ওঠা কৃষকদের ঐক্য এদেশ আগে কখনো দেখেনি।

আন্দোলনে সামিল যে হাজার হাজার কৃষক তাঁদের অবস্থান এক নয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছে শ্রেণিগত তারতম্য। ফলত কিছু সংঘাতও রয়েছে তাদের মধ্যে। এসব সত্ত্বেও কেন্দ্র সরকারের তিন নয়া কৃষি আইন ও বিদ্যুৎ বিলের প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিরুদ্ধে কৃষকেরা যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, যে প্রাণপণ লড়াই তাঁরা চালিয়ে যাচ্ছেন তা এককথায় নজিরবিহীন। দিল্লি সীমান্তে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় যারা লড়াই করছেন তাঁরা সংগ্রামী, তারা বিদ্রোহী, তারা কেউ হিন্দু না,  মুসলমান না,  শিখও না। সবাই কৃষক। তাঁদের একটাই পরিচয় তাঁরা কৃষক। যে কৃষকরা প্রতিবাদ আন্দোলনে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে ছিল ইতিবাচক ধারা। গত কয়েকদিন ধরে সেটা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। দেশের উচ্চ আদালত কেন্দ্রের নতুন কৃষি আইনের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার পর কৃষকদের বিক্ষোভ যেন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বুধবার লোহরি উপলক্ষে দিল্লি সীমান্তে আন্দোলনকারী কৃষকরা নতুন তিন কৃষি আইনের  লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি পুড়িয়ে প্রতীকী বিক্ষোভ দেখান। এতে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি হয়। এখন দিল্লিতে একদিকে যেমন প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারির প্রস্তুতি শুরু হতে চলেছে পাশাপাশি ওদিনই কৃষকদের ট্রাক্টর র‍্যালির প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। 

এমনিতেই কেন্দ্র সরকার ও অন্যান্য রাজ্যের বিজেপি সরকার এই আইন নিয়ে যথেষ্ট চাপে। পাঞ্জাব তো বটেই হরিয়ানাতেও কৃষক আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছে। জানা গিয়েছে হরিয়ানার ৬০টিরও বেশি গ্রামে নাকি বিজেপি এবং জেজেপি  নেতাদের ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। বিজেপি তথা জেজেপি বিধায়ক এবং নেতারা যাতে না ঢুকতে পারেন তার জন্য গ্রামের বাইরে রীতিমতো নোটিস ঝোলানো হয়েছে। স্থানীয় কৃষক সংগঠনগুলি নেতাদের ওপর এভাবে চাপ বাড়াচ্ছে। এ ঘটনা হরিয়ানার জোট সরকারকে রীতিমতো চাপে ফেলে দিয়েছে। একাধিক বিধায়ক ইতিমধ্যেই সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছে। চাপে পড়ে বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং উপমুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে বৈঠক করেছেন।  হরিয়ানা যে ক্রমশ কৃষক বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠছে কেন্দ্রের লোকজনও তা স্বীকার করে নিয়েছেন। 

এখন প্রশ্ন; এই আন্দোলন কি শুধুমাত্র পাঞ্জাবের কৃষকদের আন্দোলন? সিঙ্ঘু এবং টিকরি সীমান্তে যারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই হরিয়ানার কৃষক। হরিয়ানায় কৃষকদের পক্ষে জনমত কতটা তা বোঝা যায় খাপ পঞ্চায়েতের আচরণে। যে খাপ পঞ্চায়েতের কর্তারা অধিকাংশই বিজেপির কাছাকাছি বা  তাদেরই সমর্থক। কিন্তু তারা কৃষকদের আন্দোলনের সমর্থক। রাজস্থানে এনডিএ-তে ফাটল ধরেছে। রাজস্থান সীমান্তে কৃষকদের জমায়েত বাড়ছে। গাজিপুরে উত্তরপ্রদেশ সীমান্তেও কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের পুলিশ কৃষক আন্দোলনের ওপর ভয়ংকর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। সব উপেক্ষা করেও কিন্তু আন্দোলন চলছে। একে কি শুধুই কৃষক আন্দোলন বলবো?