যুদ্ধ শব্দটি শুনলেই একটা অদ্ভুত রকমের ভয়, আশঙ্কা সবকিছু কাজ করে। সেই ইতিহাসের সময় থেকে আজ অবধি বহু মানুষ-ই তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন এই যুদ্ধের জন্য। কার্গিল যুদ্ধের সময়ের
এমনই এক হতভাগ্যশালী বাবা-মা হলেন প্রাক্তন কর্নেল ভিএন থাপার ও তাঁর স্ত্রী তৃপ্তা। ২০ বছর আগে তাঁদের ছেলে বিজয়ন্ত থাপার কার্গিল যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন বিজয়ন্ত থাপার ১৯৯৯
সালের কার্গিল যুদ্ধে ২৯শে জুন মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। যুদ্ধক্ষেত্রেই লুটিয়ে পড়েছিলেন তিনি। বড় ছেলে বিজয়ন্তের এই শূন্যতা থাপার দম্পতি আজও বহন করে চলেছেন।

বসার ঘরে এখনও জ্বলজ্বল করে সেনাবাহিনীর পোষাক পরা বিজয়ন্তের ছবি। ছেলের স্মৃতি আজও অমলিন প্রাক্তন কর্নেল ভিএন থাপার ও তাঁর স্ত্রীর মনে। বিজয়ান্তের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল।
তিনি তাঁর ছেলের নাম রাখেন সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ট্যাঙ্কার 'বিজয়ন্ত'-এর নাম অনুসারে। যার অর্থ 'শেষ অবধি জয়ী হওয়া'। বিজয়ন্ত থাপারের ইউনিট ছিল ২ রাজপুতানা রাইফেলস। কার্গিল যুদ্ধে জয়ীও হয়
এই ইউনিটটি। কিন্তু, মাত্র ২২ বছর বয়সেই দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেন বিজয়ন্ত। পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে এক মরণপণ লড়াই করে রাজপুতানা রাইফেলস-এর ২ নম্বর ইউনিটকে বিজয়ী
হতে সাহায্য করেন তিনি। 
 
নয়ডাতে থাপারদের বাড়ির কাছেই আজ বিজয়ন্তের স্মৃতিতে একাধিক স্থানের নাম রাখা হয়েছে। রয়েছে বিজয়ন্ত থাপার পার্ক, বিজয়ন্ত থাপার মার্গ। বিজয়ন্তের বাবা কর্নেল থাপার জানিয়েছেন, 'বিজয়ন্ত
আমাদের গর্ব, দিন চলে গেলেও তাকে আমরা এখনও ভুলতে পারিনি। তাদের ইউনিটের এটাই প্রথম বিজয়।' যুদ্ধের আগে মাত্র ছয় মাসই আর্মিতে ছিলেন বিজয়ন্ত।
 বিজয়ন্ত যে যুদ্ধক্ষেত্রে শহিদ হয়েছেন, এই খবর কর্নেল ভিএন থাপার ফোন মারফত জানতে পারেন। সেই সময় তিনি আলোয়ারে ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো চোট পেয়েছেন তাঁর ছেলে। কিন্তু তার
চেয়েও ভয়ংকর এই খবরের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। ছেলের কথা বলতে বলতে চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আসে প্রাক্তন কর্নেলের। কার্গিল যুদ্ধের পরই তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। 

নয়ডাতে থাপারের বাড়িতে চারিদিকে ছডিয়ে বিজয়ন্তের স্মৃতি। কলেজের ছবি, ট্রফি, স্কুলের শংসাপত্র সবকিছুই সযত্নে সাজানো রয়েছে। 'নবম শ্রেণী থেকেই আমার ছেলে সেনাবাহিনীর সমস্ত রকম অস্ত্র
চালানোতে পারদর্শী ছিল। জয়স্টিকের মতো জিনিস যা অন্য বাচ্চাদের কাছে ভিডিওগেম ছিল বিজয়ন্তের কাছে তা ছিল কাল্পনিক প্লেন। এয়ার ফোর্স ছিল তার প্রথম ভালোবাসা'। বিজয়ন্তের মা তৃপ্তাদেবী-র
মনে পড়ে যায় অনেক কথা। তিনি জানান, 'বিজয়ন্তের কফিন বন্দি দেহ যখন বাড়িতে এসেছিল তখন ও চকোলেট-সহ এসেছিল, কারণ  চকোলেট বিজয়ন্তের প্রিয় ছিল।'
   
এয়ার ফোর্সের বেস ক্যাম্পে গিয়ে রাতে বিমানের মহড়া দেখতে ভালোবাসতেন বিজয়ন্ত। এছাড়া বোট রাইডও ভালোবাসতেন তিনি। প্রায় চারপুরুষ ধরে বিজয়ন্তের পরিবারের সকলে সেনাবাহিনীতে।
ছোটবেলায় ভাই-এর সঙ্গে সঙ্গে খেলার সময় বিজয়ন্ত পাকিস্তানি ভেবে আক্রমণ করত। নরম মনের মানুষ ছিল বিজয়ন্ত। কলেজের সময়ে তাঁর হাতে ৫০ টাকা থাকলেও সে তা গরীব ভিখারীকে দিয়ে দিত। 
রুকসানা নামে এক মেয়ে যার বাবা জঙ্গি আক্রমণে মারা গিয়েছিলেন তাকেও নিয়মিত টাকা পাঠাত বিজয়ন্ত। রুকসানার জন্য জামা আনার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই কথা রাখা হয়নি কার্গিলে শহিদ হওয়া
ক্যাপ্টেনের। তাঁর পরিবার আজও রুকসানাকে সাহায্য করে। বিজয়ন্তের মৃত্যুর প্রথম এক বছর খুব কঠিন ছিল তাঁর বাবা-মা-র কাছে। কিন্তু পরিস্থিতি আর সময়ের চাপে পড়ে তাঁরা তাদের ছেলেদের এই
আত্মত্যাগ মেনে নিয়েছেন।
 
প্রতি বছর কার্গিল বিজয় দিবসে বিজয়ন্তের বাবা কর্নেল ভিএন থাপার দ্রাসে যান। সেখানে গিয়ে তিনি তাঁর ছেলেকে যেন অনুভব করতে পারেন। ছেলের নামে মন্দির বানিয়েছেন তিনি। বয়সের ভারে
অনেকটাই কাবু কর্ণেল ভিএন থাপার। তাঁর এখন ইচ্ছে ছেলের নামে বই লেখার। কার্গিল যুদ্ধের সময় বিজয়ন্ত বাড়িতে বেশকিছু চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির ছত্রে ছত্রে রয়েছে বিজয়ন্তের এক অনির্দিষ্ট
যাত্রাপত্রের ইঙ্গিত। কার্গিলে যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনার মন হয়তো বুঝতে পেরেছিল নিয়তির ললাট লিখন। আপাতত একরাশ চাপা দীর্ঘশ্বাস আর ছেলে বিজয়ন্তের একরাশ স্মৃতি-এই নিয়ে জীবনের পথে
এগিয়ে চলেছেন কর্নেল ভিএন থাপার ও তাঁর স্ত্রী তৃপ্তাদেবী। কার্গিল বিজয় দিবস এবার ২০ বছর পূর্ণ করছে। ২ দশকের সন্তান হারানোর হাহাকার আরও একবার নিঃশ্বাসটা বন্ধ করে দিতে চায় তাঁদের,
কিন্তু সেনাদের অনুশাসনে লালিত-পালিত এই পরিবার তাই ছেলের আত্মত্যাগকে দেশের জন্য উৎসর্গকৃত বলেই মেনে নিয়েছেন।