আশির দশকে কংগ্রেসে ইন্দিরার পরেই যার আধিপত্য ছিল দলের মধ্যে তিনি হলেন সঞ্জয় গান্ধী। একদিকে এর কারণ যেমন ছিল, তিনি ছিলেন ইন্দিরার ছোটপুত্র, তেমনি রাজনীতিতে সঞ্জয়ের দ্রুত উত্থানও সকলের নজর কেড়েছিল। আর এই দ্রুত গতি ১৯৮০ সালের ২৩ জুন তামিয়ে দিয়েছিল তরুণ এই নেতার সব স্বপ্নকে। দিল্লির সফদরজং বিমানবন্দরের কাছেই ২ আসনের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল সঞ্জয় গান্ধীর।

তবে সঞ্জয় গান্ধীর এদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিক জরুরী অবস্থার সময় তাঁর ভূমিকার জন্যই। ২৫ জুন, ১৯৭৫ থেকে ২১ মার্চ, ১৯৭৭ পর্যন্ত ২১ মাসব্যাপী ভারতের জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ। এই জরুরী  অবস্থার পরামর্শদাতা ছিলেন ভারতের তদনীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ভারতীয় সংবিধানে ৩৫২ নং ধারা অনুযায়ী এই জরুরী অবস্থা ঘোষিত হয়েছিল। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এই ঘটনা এখনও পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত।

১৯৭৫ সালের ২৫জুন গভীর রাতে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পরের দিন ২৬ জুন অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কন্ঠে বেজে উঠেছিল ‘‘অযথা আতঙ্কিত হবেন না৷ রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করেছেন৷’ আগের রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফকিরুদ্দিন আলি আহমেদকে দিয়ে জরুরি অবস্থার নির্দেশনামা সাক্ষর করান ইন্দিরা৷ রেডিওতে তাঁর ওই ঘোষণার আগে পর্যন্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যেরই জানা ছিল না দেশে এমন ঘটনা ঘটতে হচ্ছে৷

সঞ্জয় গান্ধীকে সবাই ইন্দিরা গান্ধীর পরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হবে বলে ভাবতেন এবং এটাও ভাবা হয়েছিলো সঞ্জয়ই হবেন ইন্দিরার পরের প্রধানমন্ত্রী। তবে এক বিমান দুর্ঘটনা সেই সবের ইতি টেনে দিয়েছিল। অনেকেই বলেন দেশে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে সঞ্জয়ের বড় ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে নসবন্দির ক্ষেত্রে সঞ্জয় গান্ধীর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য তখন নসবন্দি তথা নির্বীজকরণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল সরকার। বলা হত, ইন্দিরা পুত্র সঞ্জয় গান্ধীই নাকি এই কর্মীসূচির নেপথ্য নায়ক ছিলেন। সত্তরের দশকে ইন্দিরা জমানায় এই কর্মসূচি অবশ্য রাজনৈতিক ভাবে কংগ্রেসের খুব একটা ভাল হয়নি। বরং হাত পুড়েছিল। উত্তরপ্রদেশে ভোটের ময়দানে স্লোগান উঠেছিস, 'নসবন্দি কে তিন দালাল, ইন্দিরা-সঞ্জয়-বংশীলাল।'

জরুরী অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধী জোর করে নির্বীজকরণ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ইমার্জেন্সি পিরিয়ডে এক বছরে ৬০ লক্ষ পুরুষের ভ্যাসেকটমি করা হয়েছিল। রেকর্ড হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু পরিণাম হয়েছিল ভয়ঙ্কর। শোনা যায়, সেই সময় ভুল অপারেশনের কারণে প্রায় ২ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। 

১৯৩৩ সালে হিটালারের জার্মানিতেও নসবন্দি অভিযান চালু হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আইন করা হয়েছিল, কোনও জিনগত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির নির্বীজকরণ করা যাবে। কিন্তু এদেশে ভ্যাসেকটমি জার্মানির থেকে ১৫ গুণ কড়া ভাবে প্রয়োগ করতে গেছিলেন সঞ্জয়। এর পেছনে অবশ্য কয়েকটি কারণ ছিল। এর মধ্যে প্রথমেই অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে নেতা হিসাবে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন উচ্চাকাঙ্খী সঞ্জয়। দ্বিতীয় পরিবার পরিকল্পনা কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক চাপ। তৃতীয়ত দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য পদ্ধতিগুলির কার্যকর না হওয়া। আর চতুর্থ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জরুরি অবস্থার কারণে অবারিত শক্তি পেয়ে যাওয়া। 

১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন দেশে জরুরী অবস্থা জারির পর মোটামুটি বোঝা গিয়েছিল, এদেশে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার সঞ্জয় গান্ধীর দ্বারাই পরিচালিত হবে। আর কম সময়ে নিজেকে দক্ষ প্রমাণ করতে নসবন্দিকেই কাজে লাগাতে গিয়েছিলেন সঞ্জয়। সেই সময় বৃক্ষরোপণ, পণ না নেওয়া ও শিক্ষার মতো বিষয়ে জোর দেওয়া হলেও সঞ্জয় মনে করেছিলেন যে তাঁর দ্রুত ক্যারিশমার ভিত্তি হতে পারে নসবন্দি।

ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বা আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে সঞ্জয় গান্ধী তখন ভাবেননি, সেই সময় নির্বীজকরণ মানে একজন পুরুষের পুরুষালি ব্যাপারটাই চলে যাওয়া। অনেকের কাছেই সম্মানহানির শামিল।  দেশের ৯০ শতাংশ নাগরিকই সেই সময় ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বিষয়টা বুঝত না। সেটা বোঝানোটা ছিল প্রাথমিক কাজ। ইন্দিরা গান্ধী সরকার সেটা করেনি।

তাই সঞ্জয় গান্ধীর তাণ্ডব- তুর্কমান গেটে বুলডোজার চালিয়ে গরিব মানুষের বাসস্থান উচ্ছেদ, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে জেলে পুরে দেওয়া, বলপূর্বক নাসবন্দি – জরুরী অবস্থা আজও জাতীয় ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা- তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি দেবকান্ত বরুয়ার এই বক্তব্য আজও স্বৈরাচারী শাসনের দ্যোতক হিসেবে চিহ্নিত।