তপন মালিক: কৃষক সংগঠনের বৃহত্তম জোট সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকা বেনজির ভারত বন্‌ধ দেখল গোটা দেশ। ঐক্যবদ্ধ কৃষকসমাজের প্রতিরোধ আন্দোলনের চাপে মোদী সরকারের যে ঘুম ছুটেছে সেটা ঘটনা। বিশেষ করে বনধের দিন অমিত শাহ যেভাবে খবর পাঠিয়ে তড়িঘড়ি কৃষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন তাতে বোঝা যায় চাপে তাড়া পিছু হটতে আরম্ভ করেছেন। গত দু’দিনভর লড়াকু কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বনধের সমর্থনে দেশের প্রতিটি প্রান্তে জোরালো প্রচার চলেছে। বিজেপি এবং তাদের গুটিকয় মিত্র ছাড়া দেশের অন্তত ২৫টি রাজনৈতিক দল কৃষকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবারের বনধকে সমর্থন করেছে। শ্রমিক, খেতমজুর, ছাত্র, যুব, মহিলাদের সংগঠনের পাশাপাশি সমাজের নানা স্তরের মানুষ ভারতীয় কৃষকদের সঙ্গে থাকার আওয়াজ দিয়েছেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরেও প্রবলভাবে ধিক্কৃত হচ্ছে বিজেপি-আরএসএস সরকার।

অন্যদিকে দাবি মেনে নেওয়ার বদলে বিজেপি-আরএসএস সরকার কৃষকদের বিরুদ্ধে লাগাতার মিথ্যাপ্রচার করে চলেছে। তাতে আন্দোলনকারী কৃষকদের জেদ আরও বহুগুণ বেড়েছে। গানে-স্লোগানে-শপথে মুখর কৃষকরা একটা বার্তাই ছড়িয়ে দিয়েছেন, মোদী সরকারকে নতিস্বীকার করতেই হবে। কৃষকদের স্পষ্ট মনোভাব; আগে ছিনিয়ে নিতে হবে জয় তা নাহলে বাড়ি ফেরা নয়।

প্রসঙ্গত, সারা দেশের কৃষকজোট দিল্লি থেকে এক বিবৃতিতে এআইকেএসসিসি-র কাছে প্রশ্ন রেখেছে, যখন হাজার হাজার কৃষক লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন মোদী সরকার তাদের দাবি মানতে চাইছে না কেন। কেন বৈঠক- আলোচনার নামে তাঁরা অযথা সময় নষ্ট করছে। অন্যদিকে এআইকেএসসিসি-র প্রশ্ন তবে কি কেন্দ্রের সরকার কর্পোরেট এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলির স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। যারা নিজের দেশের অন্নদাতাদের দাবি মেনে নিতে পারছেন না, তারা কিভাবে আত্মনির্ভর বিকাশ-এর কথা বলছে।

মোদী সরকার করোনা-লকডাউনের কালেই ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেপ্টেম্বরে সংসদে তিন কৃষি আইন পাশ করায়। কৃষকদের বক্রব্য, দেশের কৃষিক্ষেত্র এবং ফসল বিপণন ব্যবস্থা কয়েকটি কর্পোরেট কোম্পানির হাতে তুলে দিতেই বানানো হয়েছে ওই তিন আইন। কিন্তু কৃষকরা জোট বেঁধে আন্দোলনে নামায় কেন্দ্র এখন পড়েছে ঘোর বিপাকে। দিল্লির কঠিন শীতের ঠান্ডা উপেক্ষা করে কৃষকরা আন্দোলনে সামিল হতেই চাপে পড়ে সরকার এখন বারবার আশ্বাস দিচ্ছে, ফসলের এমএসপি তুলে দেওয়া হবেনা। কিন্তু সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যেতে নারাজ কৃষকেরা। সরকারের মুখের কথায় যে ভরসা নেই তা জানিয়ে কৃষকরা এআইকেএসসিসি-কে জানিয়ে দিয়েছে, সরকারি বিশেষজ্ঞরা খাদ্যশস্যের মজুতভাণ্ডার উপচে পড়ছে, এই অজুহাত দেখিয়েই ফসল সংগ্রহ বন্ধের সুপারিশ করছেন। এবার সরকারের নতুন আইনে বৃহৎ কর্পোরেটরা ফসল সংগ্রহের অধিকার পেলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারি মান্ডিগুলিকে অকেজো করে দেওয়া হবে। সরকার হাত তুলে নেবে। ঠিক যেমনটি হয়ে চলেছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বীমা, ব্যাঙ্কিংয়ের মতো সমস্ত ক্ষেত্রে। কৃষকদের বক্তব্য, দেশের কৃষকরা এসব আইনের অর্থ এখন বোঝে। তাই প্রত্যাহার না করলে কৃষকরা আন্দোলন থেকে সরবে না। মঙ্গলবারের ভারত বনধ আর তাতে দেশের রাজনৈতিক দল থেকে সাধারণ মানুষদের সমর্থন কৃষকদের লড়াইয়ের মনোবল দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।  

দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রের নতুন তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে বিগত ১২ দিন ধরে লাগাতার আন্দোলন আর সেই আন্দোলনের অংশ হিসেবে মঙ্গলবারের ভারত বনধ ডাকের মধ্যেও নরেন্দ্র মোদী কৃষি আইন সংস্কারের পক্ষেই সওয়াল করেছেন। আসলে মোদী সরকারের অবস্থা হয়ে উঠেছে সাপের ছুঁচো গেলার মতো। আন্দোলনের চাপে কৃষি আইন প্রত্যাহার মানে চরম হার স্বীকার। উঠবে সরকারের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন। যে কারণে আইন প্রত্যাহারের পথে না গিয়ে তারা দু'টি সংশোধনীতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু কৃষকরা তা মানবেন না। যে কারণে মঙ্গলবারের আগে শেষ বৈঠকে কৃষকরা কোনও কথার উত্তর দেন নি। কোনও রফাসূত্র বেরোয় নি। আর তাতে আরও চাপ বাড়ে কেন্দ্রের। আজ বুধবার বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই অমিত শাহ কৃষকদের বৈঠকের আহ্বান জানান। আন্দোলনকারী কৃষকদের ক্ষোভের আগুনে জল ঢালতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি আলোচনায় বসেন। কিন্তু টানা সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকেও কোনও রফাসূত্র মিলল না। কারণ; কৃষকরা কেন্দ্রের কাছ থেকে কেবলমাত্র শুনতে চান তিন আইন প্রত্যাহার করছে কিনা। এই 'হ্যাঁ' বা 'না'-উত্তরটাই তারা পেতে চান। অন্য কোনও আলাপ আলোচনা বা কথা তারা যে শুনবেন না তা আগেই তাঁরা ঠিক করে নিয়েছেন। ফলে কেন্দ্রের আলোচনায় তারা আর সময় নষ্ট করবেন না। ফলে আজ বুধবার মোদী সরকারের সঙ্গে কৃষকদের বৈঠক হচ্ছে না। সরকার প্রস্তাব দিয়েছে কৃষকরা আলোচনা করে নিন ফের বৃহস্পতিবার বৈঠক হবে। কিন্তু কৃষকেরা কি আদৌ বৈঠকে বসবেন?