অসমের তেল কূপের আগুন আর গ্যাস লিক সমস্যায় ফেলে দিতে পারে ডিব্রু সাইখোয়া ন্যাশানাল পার্ক আর সংলগ্ন মাগুরি মোটাপাং বিল এলাকা। যা জীববৈচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট হিসেবেই পরিচিত। স্থানীয়দের কথায় এখনও প্রতিবছরই প্রচুর পর্যটক আসেন। এখানে ৩৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণি রয়েছে। আর ৩৮২ প্রজাতির পাখি দেখতে পাওয়া যায়। মাগুরি বিলের কিছুটা অংশ পাখিদের জন্য সংরক্ষিত। এভিয়ান ও জলজপ্রাণিদের পছন্দের তালিকার মধ্যেও পড়ে। কিন্তু গ্যাস লিক আগুনের উত্তপাত প্রভাব ফেলছে এই এলাকায়। যা নিয়ে রীতিমত চিন্তিত স্থানীয় বাসিন্দারা। 

ডিগবোই কলেজের বাণিজ্যের ছাত্র দেবরশি গগৈ-এর আশঙ্কা কূপ থেকে তেল তোলার শব্দ আর বাতাসে ভেসে আসা দুর্গন্ধ পাখিদের তাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর কথায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে তাঁর বাড়ি। সেখান থেকেই তেনি এই শব্দ শুনতে পান। তাহলে তেলকূপের কাছে থাকা প্রাণিদের অবস্থ কতটা খারাপ হতে পারে চিন্তা করে দেখুন? এই প্রশ্ন শুধু দেবরশি গগৈ-এর নয়। স্থানীয় অনেক বাসিন্দাদরই। স্থানীয় এক শিক্ষক জানিয়েছেন তেল কূপ থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে তাঁর বাড়ি। যেদিন গ্যাস লিক হয় সেদিনই তিনি তাঁর সন্তানদের তিনসুকিয়ায় এক আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তার পরিস্থিতি এতটা ভয়বাহ যা শিশু ও বৃদ্ধদের কাছে অনেক বেশি উদ্বেগের। 

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি শুধু উদ্ধেগের মধ্যেই সীমাবব্দ নেই। পাখি গাইড হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির  কথায় তেল কূপের আগুন ইতিমধ্যেই প্রাণ কাড়তে শুরু করেছে বন্য প্রাণিদের। বিশেষ শোচনীয় অবস্থা পাখিদের। তাঁর কথায় ৬ই জুন একটি রাজা কোয়েল প্রজাতির পাখিকে উদ্ধার করে তুলে দেওয়া হয়েছে বন দফতরের হাতে। ৯ জুন তেল কূপে অগ্নিকাণ্ডের পর বাস্তুতন্ত্রের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে বলেই আশঙ্কা করা হয়েছে। কারণ তেল কূলের সংলগ্ন এলাকায়  রয়েছে এই বনভূমি। 

তেল কূপে আগুন লাগার আগেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বনদফতরের এক কর্তা রাজেন্দ্র সিং ভারতী। তিনি বলেছিলেন, শুধু গ্যাস নয় শব্দের দ্বারাও প্রভাবিত এই অঞ্চলের জীব বৈচিত্র।  বাঘজান কূপ থেকে প্রায় ৯০০ মিটার দূরে এই জাতীয় অরণ্য। বন্যপ্রাণিদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মাগুরি  মোটাপাং বিল আর ডিব্রু সাইখোয়া ন্যাশানাল পার্ক  এলাকায় থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বনভূমি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাও বিশ্লষণ করে দেখা হবে বলেও সূত্রের খবর। 


তেল কূপের আগুন শুধু যে অরণ্যভূমির ক্ষতি করেছে তা নয়, ক্ষতি হয়েছে কৃষি জমিরও। স্থানীয়দের একটা বড় অংশ পেশায় কৃষক। অনেকেই মূল জীবিকা পশুপান আর মাছ ধরা। কিন্তু তেলকূপের দুর্ঘটনা তাদেরও সমস্যায় ফেলেছে। বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে তেল ছড়িয়ে পড়ায় চরম ক্ষতি মুখে পড়েছে কৃষকরা। আর প্রবল ক্ষতি হয়েছে জলাভূমিক। জলে তেল মিশে যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে জলজ প্রাণি। গৃহপালিত প্রাণিরও সমস্যা বাড়ছে। ইতিমধ্যেই কূপের আগুনের গ্রাসে চলছে গেছে একটি গ্রাম। জ্বলেখাঁক হয়ে গেছে বাড়িঘর।  তেল কূপের আগুন গোটা এলাকার চালচিত্র বদলে দিয়েছে বললেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে ইতিমধ্যেই ওয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সেই সাহায্য যথেষ্ট নয় বলেই দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।