উত্তর-পূর্ব দিল্লির শিববিহার। গত সপ্তাহের নজিরবিহীন হিংসার আগুন উত্ত পূর্ব দিল্লির যে যে এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম এই শিববিহার। দীর্ঘদিন হিন্দু-মুসলমান পরিবার পাশাপাশি মিলেমিশে বসবাস করার পর এই তিনদিনের হিংসায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে এই এলাকার স্বাভাবিক ছন্দ। বহিরাগত হামলাকারীরা এমনই জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছে যে এলাকার হিন্দু বাসিন্দারা এখন 'জয় শ্রী রাম' জপ করতে লজ্জা পাচ্ছেন। ঘৃণাবোধ করছেন। সেই মন্ত্র বাতিল করে তারা 'হর হর মহাদেব', 'বীর বজরঙ্গবলী' বলে স্লোগান দিতে দিতে রাত পাহাড়া দিচ্ছে।

তিনদিন ধরে লাগামহীন হিংসার পর শিববিহার এলাকা দেখলে এখন ভূতের শহর বলে মনে হবে। বেশিরভাগ মুসলিম পরিবার এলাকা ছেড়ে শহরের অন্যত্র, কেউ কেউ আরও দূরে কোথাও চলে গিয়েছেন। আর যে বাসিন্দারা থেকে গিয়েছেন, গত রবিবার থেকে তাদেরও রাতে ঘুম নেই। রাতের খাওয়া শেষ করেই তারা এক জায়গায় জড়ো হচ্ছেন। একটি ছোট আগুন জ্বালিয়ে একেবারে সকাল হওয়া পকেটে লঙ্কার গুঁড়ো ভরা ছোট ছোট প্যাকেট নিয়ে দলে দলে ঘুরে পাহারা দিচ্ছেন। মহিলারা তাদের চা বিস্কুট জোগাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার রাতে এরকমই তারা 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।

তারপর থেকে স্লোগান হিসাবে 'হর হর মহাদেব', 'বীর বজরঙ্গি' ব্যবহার করছেন। কারণ, হিংসার সময় হামলাকারীরা 'জয় শ্রীরাম' বলে চিৎকার করতে করতেই এলাকায় ঢুকে বাড়িঘর এবং দোকানপাট জ্বালিয়ে দেয়। সেই থেকে 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান-কে দুর্বৃত্ত ও হামলাকারীদের স্লোগান হিসেবেই দেখছেন তাঁরা। তাঁদের থেকে নিজেদেরকে আলাদা করতেই 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান পাল্টে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গত রবিবার থেকেই সিএএ আইন নিয়ে এই আইনের সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে চরম বিরোধ বাধে। তারপর থেকে তিনদিন ধরে চরম হিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়ে উত্তরপূর্ব দিল্লিতে। উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে এই নজিরবিহীন হামলায় ৪৫ জন মারা গিয়েছেন এবং প্রায় তিনশ লোক আহত হয়েছেন। বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ধর্মীয় স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। প্রচুর যানবাহনও পুড়ে গিয়েছে।

সোশ্য়াল মিডিয়ায় এই হিংসার বেশ কিছু ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটিতে হিংসার সময় উন্মত্ত দৃর্বৃত্তদের ধর্মীয় স্লোগান দিতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ তারা 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান দিয়েছিল, কারণ তারা জানত, এতে তাদের কেউ আটকাবে না। আর একবার এলাকায় ঢুকে পড়ার পর তাণ্ডব চালিয়েছে তারা। শিববিহারের স্থানীয়দের দাবি, গত বৃহস্পতিবার হিংসা অনেকটা থিতিয়ে যাওয়ার পরও সেখানে একদল যুবক 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান দিয়ে দোকানপাট ভেঙচুর করেছে, লুটতরাজ চালিয়েছে।

স্তানীয়রা জানিয়েছেন গত এক সপ্তাহ ধরে তাঁরা অফিস কাছারিতে যেতে পারেননি। গোটা রাত তারা জেগে পাহারা দিচ্ছেন, তারপর সকালে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে তারপর বের হচ্ছেন প্রতিদিনের খাওয়াদাওয়া জোগার করতে। আতঙ্কের পরিবেশে এখনও অধিকাংশ দোকানই বন্ধ থাকছে। তাই রসদ সংগ্রহ করাটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিববিহার দিল্লি এবং উত্তর প্রদেশের একেবারে সীমান্তে অবস্থিত। বাসিন্দাদের অভিযোগ হামলাকারীরা সকলেই উত্তরপ্রদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিল। হিংসা ছড়িয়ে আবার সেই পথেই কেটে পড়েছে। বেশিরভাগের মুখ হেলমেটে ঢাকা ছিল, নয়তো স্কার্ফ পরেছিলেন। যে মুখগুলি দেখা গিয়েছে তাদেরকেও বাসিন্দারা চিনতে পারেননি।