১৯২৯ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন ভগত সিং এবং তাঁর সহযোগী বটুকেশ্বর দত্ত। তারপর বিধায়কদের উপরে লিফলেট ছড়িয়ে দিয়েছিল, স্লোগান দিয়ে তুলেছিল 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর ডাক।  তারপরে বরণ করে নিয়েছিলেন গ্রেফতার। ব্রিটিশ সরকারের গোপন নথি থেকে জানা যায়, ভগত সিং ও তার সহযোগীদের প্রথমে ফাঁসি দেওয়ার কথা ছিল না, দ্বীপান্তরের সাজা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারপরেই কেউ একজন লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার বিষয়টি আবিষ্কার করেছিলেন, আর তাতেই বদলে গিয়েছিল মামলার গতি প্রকৃতি।

কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের আগে অত্যাচারী ইংরেজ অফিসার জেমস স্কটকে হত্যা করতে গিয়ে ভ্রমবশতঃ হত্যা করেছিলেন জন সন্ডার্স নামে এক ইংরেজ অফিসারকে। সেই অভিযানে হত হয়েছিল চরণ সিং নামে ইংরেজ পুলিশের এক কনস্টেবল-ও। সেই বিষয়টি সামনে আসতেই ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভগৎ সিং একটি অধ্যায়ের নাম। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস পথের বাইরে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে স্বাধীন ভারতকে দেখতে চেয়েছিলেন এই বীর শহিদ। কিন্তু, তাঁর সম্পর্কে ভারতের পরবর্তী প্রজন্মকতে জানানোর মতো বিশেষ তথ্য আমাদের হাতে নেই। কারণ উপরে বর্ণিত বিস্ময়কর তথ্যের মতোই তাঁর সম্পর্কে প্রায় সব তথ্য, গোপন নথিপত্র সবই নিজেদের দখলে রেখে দিয়েছে পাকিস্তান।

এখন প্রশ্ন হল শহিদ ভগৎ সিং-এর এই সমস্ত সংরক্ষিত জিনিস, নথিপত্রের দখল পেল কীকরে পাকিস্তান? ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীদের বিচার, ফাঁসি এবং অন্তিম সংস্কার - সবটাই হয়েছিল অবিভক্ত ভারতের লাহোর শহরে। তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের যাবতীয় নথিপত্র সব লাহোর কারাগারেই ছিল। স্বাধীনতার আগে দেশভাগের সময়, সম্পদের বিভাজনও করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে লাহোর শহর পড়েছিল ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান-এর ভাগে। আর তাতেই লাহোর শহরের সঙ্গে সঙ্গে ভগত সিং ও তাঁর আন্দোলন সম্পর্কিত যাবতীয় ঐতিহাসিক সম্পদও চলে যায় পাকিস্তানের হাতেই।

দীর্ঘ ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেইসব নথিপত্র অবহেলায় ফেলে রাখার পর ২০১৮ সালে, প্রথমবার পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রাদেশিক সরকার লাহোরে বিপ্লবী ভগত সিং এবং তাঁর সঙ্গীদের বিচারের সংক্রান্ত ফাইলপত্রের একটি প্রদর্শনি আয়োজন করেছিল। সেখানে কীভাবে ব্রিটিশ পুলিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভগত সিংয়ের দলের প্রায় ২৪-২৫ জন সদস্যক আটক করেছিল, কীভাবে ভগত সিং-এর দলের সঙ্গে তারা হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি এবং নওজোয়ান ভারত সভার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিল, এএসপি সন্ডার্স এবং কনস্টেবল চরণ সিং-এর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট,
ভগত সিং-এর দলের বিভিন্ন নথি, ইস্তেহার, - এরকম বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল প্রদর্শিত হয়েছিল।

তবে, এছাড়াও ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীরা কোন কোন জায়গায় আশ্রয় নিতেন, কী কী বই, উপন্যাস, বিপ্লবী সাহিত্য পড়তেন, জেল থেকে লেখা বাবাকে লেখা ভগত সিং-এর চিঠি, রাজনৈতিক বন্দীদের প্রাপ্য সুবিধার দেওয়ার জন্য ভগত সিং-এর আবেদন, কারাগারে বই এবং সংবাদপত্রের জন্য ভগত সিং-এর করা আবেদন, আন্ডারগরাউন্ডে থাকার সময় তিনি এবং তাঁর দলের অন্যান্যরা কোন কোন হোটেলে উঠেছিলেন সেগুলির রেকর্ড - ভগত সিং-এর সঙ্গে সংযুক্ত এমন আরও অনেক দুর্লভ ঐতিহাসিক জিনিস পাকিস্তানের হেফাজতে রয়েছে। এমনকী তরুণ বয়সে মৃত্যুবরণকারী এই বিপ্লবীর পৈত্রিকগ বাড়িটিও বর্তমানে পাকিস্তানের ফয়জলাবাদ-এ অবস্থিত।