নির্ভয়াকাণ্ডে-র পর কিন্তু থমকে যায়নি ভারতের বুকে নারী নির্যাতনের সংখ্যা। উল্টে বেড়েই চলেছে এর মাত্রা। গত দেড় বছরেই কলকাতা শহরের বুকে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন একাধিক নারী। এদের মধ্যে অনেকে আবার বিবাহিত। হায়দরাবাদে মহিলা ভেটেনারি চিকিৎসকের গণধর্ষণ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ফের উঠে এসেছে নারী নির্যাতনের হিসেব-নিকেশ। আর এই প্রসঙ্গেই সামনে এসেছে মধুমিতা পাণ্ডের কাহিনি। 

নর্থ ওয়েলস-এর বাঙ্গোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি-র পিএইচডি-র ছাত্রী মধুমিতা। বছর কয়েক আগে তাঁর গবেষণাপত্র নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। কারণ, জেলে ঢুকে ১২২ জন ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। এই ধর্ষকদের কাছ থেকে যে উত্তর মধুমিতা পেয়েছিলেন তা রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। বিশ্বখ্যাত সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট-ও ঢালাও করে মধুমিতার গবেষণা নিয়ে স্টোরি করেছিল। হায়দরাবাদে মহিলা ভেটেনারি চিকিৎসককে গণধর্ষণ এবং হত্যার পরে মধুমিতার সেই গবেষণালব্ধ বিষয় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে সামনে আসছে ভারতে নারী নির্যাতনের না বদলানো ছবিটা-ও। 

২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার পথে চলন্ত বাসে নৃশংসভাবে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন নির্ভয়া। তাঁর সঙ্গে থাকা পুরুষবন্ধুটিও বেধড়ক শারীরিক অত্যাচার এবং মারধরের শিকার হয়েছিলেন। নগ্ন অবস্থায় নির্ভয়া ও তাঁর পুরুষবন্ধুকে বাস থেকে প্রায় ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। নির্ভয়ার যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল লোহার রড এবং বিয়ারের বোতল। লড়াই করেছিলেন নির্ভয়া। প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় পাঞ্জা লড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু, লড়াইটা একসময় থমকে গিয়েছিল। এই নৃশংসতায় প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল নাগরিক সমাজ। মনে হয়েছিল এরপর হয়তো ভারতবর্ষ থেকে ধর্ষণ জিনিসটাই মুছে যাবে। তা হয়নি। নির্ভয়াকাণ্ডের পরও ভারত সাক্ষী হয়েছে একের পর এক নৃশংস নারী নির্যাতন আর নারী হত্যার। যারমধ্যে এই বাংলার বুকেই ছিল কামদুনি ও কাকদ্বীপের ঘটনাও। কামদুনিতে এক কলেজ পড়ুয়াছাত্রীকে গণধর্ষণ করে তাঁর পা চিড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। কাকদ্বীপেও এক স্কুল পড়়ুয়া ছাত্রীকে গণধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। 

মধুমিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, নির্ভয়াকাণ্ড যখন ঘটেছিল তখন তিনি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠরতা। দিল্লি-র মেয়ে হওয়ার সুবাদে জানতেন প্রতিনিয়ত এখানে কীভাবে নারীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পুরুষদের হাতে টিজ হওয়াটা বা ধর্ষিত হওয়াটা এখানে যেন মুড়ি-মুড়কির মতো বলে বোধ করেন মধুমিতা। কেন এমনটা হয়? কেন পুরুষরা নারীদের এভাবে নির্যাতন করতে ভালোবাসে? সাইকোলজির ছাত্রী মধুমিতা-কে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত এই সব প্রশ্ন। 

সেই তাগিদেই পিএইচডি-তে তিনি ধর্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করেন। গবেষণার মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেন ভারতীয় সমাজে নারী নির্যাতনের পিছনে রয়েছে পুরুষদের প্রবল অজ্ঞানতা এবং তাদের আধিপত্য কায়েমের বিষয়টি। যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সমাজের সনাতনি প্রথা। এই প্রথায় নারীর মূল্য শুধুই মুখে। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে নারী সমাজের পুরুষদের কাছে শুধুই ভোগের বস্তু এবং গৃহস্থালি সামলানোর একটা হাতিয়ার মাত্র। নারীর ভাবনা বা নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন যেখানে একদমই গুরুত্ব পায় না। 

মধুমিতা তাঁর গবেষণায় তিহার জেলেও একাধিক জনকে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এরা সকলেই কোনও না কোনও ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত আসামী। তিহার জেলে বন্দি নির্ভয়াকাণ্ডের দোষীদের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন মধুমিতা। অন্যতম দোষী মুকেশে-র বয়ান অবাক করে দিয়েছিল মধুমিতা-কে। মুকেশ জানিয়েছিল, বাসের মধ্যে নির্ভয়া ও তাঁর পুরুষবন্ধু বেশি প্রতিরোধ না করলেই পারত। তাহলে হয়তো প্রাণে মরতে হত না নির্ভয়াকে। মধুমিতার কথায়, অধিকাংশ ধর্ষকই বোঝে না তারা কী পরিমাণ ঘৃণ্য অপরাধ করেছে। এমনকী, যৌন সঙ্গম করার জন্য যে মহিলাদের সম্মতি প্রয়োজন তা নিয়েও এই ধর্ষকদের কোনও ধারনা নেই। সাক্ষাৎকারে ধর্ষকরা যে বয়ান দিয়েছে তাতে মধুমিতা দেখিয়েছেন যে এই সহ অপরাধী মনে করে তাদেরকে অহেতুক জেলে রাখা হয়েছি শুধু নয়, অযথা তিল-কে তাল করে দেখানো হচ্ছে। এদের চোখে নারী শুধুই পুরুষের প্রয়োজন মেটানোর একটা বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। 

মধুমিতা তাঁর গবেষণাপত্রে আরও দেখিয়েছিলেন যে, দুই একজন ধর্ষক শুধু তাঁর সামনে কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন তুলেছেন মধুমিতা। কারণ, এক বছর ৪৫-এর ধর্ষক একটি ৫ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে। জেলের মধ্যে এই নিয়ে ওই ধর্ষক মধুমিতার সামনে দুঃখ প্রকাশ করে। এমনকী, এই অপরাধের জন্য ফুলের মতো একটি শিশুর জীবন নষ্ট হয়েছে বলেও সে স্বীকার করে নেয়। চমক ছিল ওই ধর্ষকের এরপরের বয়ানে। কারণ, মধুমিতা-কে ওই ধর্ষক জানিয়েছিল যে বছর পাঁচের ওই মেয়েটিকে তো কেউ আর বিয়ে করবে না, তাই সে ঠিক করেছে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তাকে বিয়ে করবে সে। মধুমিতা এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ধর্ষক অনুতপ্ত হলেও সে বোঝে না যে বছর পাঁচেকের মেয়ের সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্যটাকে। ফলে, ঘৃণ্য অপরাধ করেও বহু পুরুষ ভালোমানুষি দেখানোর চেষ্টা করে। মধুমিতা ওই ধর্ষকের কাছ থেকে ধর্ষিতা পাঁচ বছরের মেয়েটির বাড়ির ঠিকানাও জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু ওই শিশুর বাড়িতে গিয়ে মধুমিতা জানতে পারেন ঘটনায় অভিযুক্ত যে জেলে তার কোনও তথ্য ওই পরিবারের কাছে নেই। 

গবেষণার কাজে মধুমিতা দুটি বিষয়কে সামনে রেখেছিলেন, একটি হল নারীদের প্রতি ধর্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্ষকদের পারিবারিক পরিচয় এবং আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি। 
দুটি ক্ষেত্রেই মধুমিতা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, নারীদের প্রতি পুরুষদের অজ্ঞতা যে শুধুমাত্র আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা অশিক্ষিত পরিবারে রয়েছে এমনটা নয়, এই দোষে সমানভাবে দুষ্ঠ স্বচ্ছল পরিবারও। আজও আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ অসংখ্য পরিবার রয়েছে যেখানে গৃহবধূরা স্বামীর নাম ধরে ডাকেন না। সুতরাং, ভারতীয় সমাজে নারী নির্যাতনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক সামাজিক প্রেক্ষাপট। যেখানে পুরুষদের মানসিকতার বদল না এলে ধর্ষণের মতো নৃশংস ও ঘৃণ্য অপরাধ-কে ঠেকানো সম্ভব নয়। 

সম্প্রতি সামনে এসেছে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য। এতে দেখা গিয়েছে ফি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নারী নির্যাতনের সংখ্যা। এই বৃদ্ধির হারটা ফি বছরই কয়েক গুণ। হায়দরাবাদ গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ফের নৃশংসতাকে সামনে আনল বটে, কিন্তু এতে কী পুরুষরা নিজেদের মনোভাবকে বদলে ফেলতে সমর্থন হবেন না কি আইনের কড়া দণ্ডীপাকেই লুকিয়ে রয়েছে এর সমাধান? প্রশ্ন অনেক। ফের একবার সময় এবং ঘটনার জেরে তৈরি হওয়া প্রতিবাদ মানসিকতার দিকে তাকিয়ে ছাড়া কোনও গতি নেই।