ওয়েস্টেজ হিট বা নির্গমিত বর্জ্য তাপকে বৈদ্যুতিকরণ করার প্রযুক্তি আবিষ্কার হল বাংলার ছেলের হাত ধরেই। ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত গড়লেন  যাদবপুরের প্রাক্তনী। আর সেই পরশ পাথর অর্থাৎ যে বিশেষ পদার্থ বা প্রযুক্তি এই রুপান্তরটা করতে পারে, সেই  আবিষ্কারটাই করে ফেলেছেন  জহরলাল নেহেরু সেন্টার ফর অ্য়াডভান্স সায়েন্টিফিক রিসার্স (JNCASR)-র বিজ্ঞানী ড. কণিষ্ক বিশ্বাস (Kanishka Biswas)। 

ওয়েস্টেজেই উড়ান 

  ড. বিশ্বাস জানিয়েছেন, আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু এনার্জি ব্যবহার করি, তার বেশিরভাগটাই তাপ হিসেবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।  খুব সহজে ফোনে চার্জ দিলে ফোনটা গরম হয়ে ওঠে।  ল্যাপটপ, ফ্রিজ প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটে। বাইক সহ যে কোনও গাড়ির ক্ষেত্রেই আমরা যে ফুয়েল ব্যবহার করি, তার অনেকাংশেই  নির্গমণ নল দিয়ে বর্জিত তাপ হিসেবে বেরিয়ে যায়। প্রতিক্ষেত্রেই এই  (Wastage Heat) নির্গমিত তাপ এর পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ। এর পাশাপাশি বড় শিল্পক্ষেত্র যেমন ক্যামিকেল, থার্মাল, স্টিল, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমানে (Wastage Heat)বর্জ্য তাপ  নির্গমণ হয়। আর সেই তাপকেই দৈনন্দিন জীবনে পুনরায় ব্যবহার যোগ্য করে তোলা যায়। ওই (Wastage Heat) নির্গমিত তাপকে তড়িৎ-এ রূপ দিয়ে চালানো যায় যেকোনও প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক গ্য়াজেট।  

 
কাঁচ-কেটলি,  ডেইলি লাইফের কিছু বেসিক ফান্ডায় বিজ্ঞান

এবার জেনে যাক একেবারে ডেইলি লাইফের কিছু বেসিক ফান্ডা।  ধাতুর (Metal) তৈরি জিনিস যেমন একদিকে তাপ পরিবাহক (Heat Conductor) , আবার তড়িৎ পরিবাহক (Electric Conductor)। যেমন ধরে নেওয়া যাক অ্যালুমিনিয়ামের ভাতের হাঁড়িটা উপুড় দিতে গেলে  হাতে ছ্যাঁকা লাগে, তাই আমারা মোটা কাপড় নিই। তাহলে অ্যালুমিনিয়াম হল তাপ পরিবাহক। আবার ওই মোটা কাপড়টা তাপ পরিবহন করে না বলেই হাতে গরম লাগে না। একই ঘটনা চায়ের দোকানে ধাতব কেটলির ক্ষেত্রেও ঘটে। হাতে যাতে তাপ না লাগে অনেক ক্ষেত্রেই কেটলির হাতলে অনেকে  কাপড়ের বা বেতের বা প্লাস্টিকের দড়ি বেঁধে নেয় এরা তাহলে তাপ পরিবহণ করে না । এবার প্রশ্ন আসছে অ্যালুমিনিয়াম বা কপারের কোনও সামগ্রী তড়িৎ পরিবহণ করে কি, উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ। কারণ আমরা যদি রাস্তার উপর বিদ্যুৎ এর তার গুলির দিকে তাঁকাই বা ফ্যানের কয়েল এরা প্রত্যেকেই তাপ এবং তড়িৎ দুইই পরিবহন করে। 

যুগান্তকারি আবিষ্কার


এদিকে কাঁচের কাপ যেমন একদিকে তড়িৎ পরিবহণ করে না, তেমনি তাপও পরিবহণ করে না।   ড. বিশ্বাস জানালেন,  এই কাঁচ এবং মেটালের দুইই চরিত্র সম্পন্ন (Properties)  কোনও পদার্থর ( Element) খোঁজ করছিলেন তিনি । অর্থাৎ সেই বিশেষ পদার্থটি উত্তম তড়িৎ পরিবাহক  (Good Electrical Conductor) কিন্তু তাপ  পরিবহণ করে না বললেই চলে (Bad Thermal Conductor)। অবশেষে তিনি সেই যুগান্তকারি আবিষ্কারটি করে ফেলেছেন। উল্লেখ্য তার এই আবিষ্কার আমেরিকার 'সায়েন্স' (Science) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।  

 

 বিজ্ঞানে প্রেম নাকি প্রেমে বিজ্ঞান ?


 এটা ফেব্রুয়ারি মাস। বাঙালির প্রেমের মাস। তবে অন্য মাসে প্রেম জমে কিনা সে প্রশ্ন বিজ্ঞাপণী জগতের জন্য তুলে রাখা থাক। বরং ধরে নেওয়া যাক একটি ছেলে খুবই মেধাবী, আছে চাকরি, গাড়ি-বাড়ি।  শুধু ছন্দটাই নেই, এই যা। অবশ্যই সেই ছন্দ ফিরে আসে, ছেলেটি যখন একজনের প্রেমে পড়ে বা কাউকে বিয়ে করে। এক্সট্রিম কেসে যাবেন না কিন্তু।  এখানে সিলভার অ্যান্টিমণি টেলুরাইড (Silver Antimony Tellluride) হল সেই মেধাবী ছেলেটা। আর তাকে ক্যাডমিয়াম ডোপিং (Cadmium doping) করানো মানে হল, তাঁকে প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে অর্ধাঙ্গিনী করা। সিলভার অ্যান্টিমণি টেলুরাইড নিজে একা থাকলে যে ডিস-অর্ডার (Disorder) থাকে, তাকে পরিপূর্ণতা দেয় বা অর্ডারে আনে ক্যাডমিয়াম ডোপিং। অর্থাৎ চাই এমন এক পদার্থ যে তাপমাত্রার পার্থক্যকে বজায় রাখবে। যার একদিকে ঠান্ডা ও অপরদিকে গরম।  কেবল মাত্র তাপ আদান প্রদান না হতে পারলেই এটা সম্ভব। তড়িৎ যাক  বহাল তবিয়তে। এর সঙ্গে প্রেম না মেলানো ভাল। ঘেটে চচ্চড়ি হবে। ভাবতে বসবেন, বিয়ে হবে- অথচ উষ্ণতার আদান-প্রদান হবে না, এদিকে  বিদ্যুৎ যাতায়াত করবে, এ কেমন কথা !  তাই প্রেম থাকুক বিজ্ঞানে-বিজ্ঞানীর জীবনে, উদাহরণে বরং ইতি টানা যাক। 
 

ফিরে দেখা ইতিহাস, প্রজেক্টে রাষ্টীয় সাহায্য
  

 প্রসঙ্গত, ২০০ বছর আগে বিজ্ঞানী সীবেক এই তাপ-তড়িৎ বিদ্যা আবিষ্কার করেছিলেন। বিগত ৬০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা যোগ্য পদার্থ (Efficient Material) বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ পদার্থগুলি তৈরি লেড অর্থাৎ সীসা (Pb) দিয়ে। যেটা মূলত টক্সিক।  শেষ অবধি  ড. কণিষ্ক বিশ্বাসের হাত ধরেই প্রথম সামনে আসে ক্য়াডমিয়াম ডোপ- সিলভার অ্যান্টিমণি টেলুরাইড। এই প্রজেক্টটি স্বর্ণ জয়ন্তি ফেলোশিপ ফর্ম ডিপার্টমেন্ট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি গভঃ অব ইন্ডিয়া-র সাহায্য প্রাপ্ত। 

বাংলার ছেলে কনিষ্ক, যাদবপুরের প্রাক্তনী

  কণিষ্ক বিশ্বাসের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার হাবড়ায়। এক ডাকে তাঁকে বিড্ডু বলেই সবাই চেনে।  ছোটবেলায় বাবা-কাকা-ঠাকুমার মাঝে বড় হওয়া ছেলেটি আদরের হলেও ভূল করলে মারতে পিছপা হত না তাঁর মা-বাবা। পা ছড়ে যাওয়ার পরও চুটিয়ে ফুটবল খেলা হোক,  ক্রিকেট ম্য়াচ বা পুকুরে গিয়ে দাবড়িয়ে সাঁতার কাঁটা হোক, সবেতেই কেটেছে তাঁর শৈশব। হাবড়া হাই স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে কণিষ্ক রসায়ন বিভাগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্য়ালয়ে ভর্তি হন।  যাদবপুরে পড়াকালীন কণিষ্ক মাস্টার ডিগ্রি -সহ পিএইচডি জন্য ইন্ডিয়ান ইন্সিটিউট অব সায়েন্সে ব্য়াঙ্গালোর (IISC) সুযোগ পান। কেমিস্ট্রির উপর পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ করেন শিকাগোর নরর্থ ওয়েস্টার্ণ ইউনিভারসিটিতে (Northwestern University)। এরপর তিনি ফিরে আসেন  দেশের মাটিতেই, তৈরি করেন নিজস্ব রিসার্স গ্রুপ  (JNCASR) জেএনসিএএসআর- ব্য়াঙ্গালোর । কারণ এখনও যে তাঁর পথ চলা বাকি এক আলোকবর্ষ।