অগাস্ট মাসে লকডাউন ঘোষণা করেও বারবার তা বদলেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সরকারিভাবে সাংবাদিক সম্মেলন করেও পরে তা বদলে দেওয়া হয়। এই ভাবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিন বারেরও বেশি লকডাউনের দিন বদলানো হয়েছিল। এমনকী, বিভিন্ন উৎসব এবং পরবের কথা মাথায় রেখেও পরে লকডাউনের দিন বদলানো হয়।  লকডাউনের দিনক্ষণ বদলে দেওয়া হয়েছিল তৃণমূল ছাত্র পরিষদের জন্মদিনে। কারণ, টিএমসিসিপি-র জন্মদিনের দিনকে লকডাউন ঘোষণা করেছিল সরকার। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই বিতর্ক তৈরি হতে লকডাউনের সেই দিন বদলে দেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বারবার লকডাউনের দিন পরিবর্তন হওয়ায় এই নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। লকডাউনের সদর্থকতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। এমনকী, লকডাউনের নামে রাজ্য সরকার প্রহসন করছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। 

বৃহস্পতিবার রাজ্য সভায় অতিমারি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লকডাউন পদ্ধতিকেই প্রশ্নের মুখে ঠেললেন বিজেপি সাংসদ রাজীব চন্দ্রশেখর। পশ্চিমবঙ্গ সরকারি পুরো লকডাউনের নামে যে ভাবনাকে আমদানি করতে চাইছে তা আসলে কলকাতায় নয়া আবিষ্কার বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। রাজীবের বক্তব্য রাখার আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের এক সাংসদ রাজ্যসভায় পশ্চিমবঙ্গের লকডাউন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। সেখানে এমন দাবি করা হয় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যে লকডাউনের ভাবনার আমদানি করেছে তা অভিনব এবং অতিমারির এই পরিস্থিতিকে বশ করতে সক্ষম। বিজেপি সাংসদ রাজীব চন্দ্রশেখর লকডাউন প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকার যেভাবে লকডাউন করছে তা কোনওমতেই সময় উপযোগী নয়। আর এই ধরনের লকডাউনে অর্থনীতির অত্যাবশকীয় আদান-প্রদানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এমনকী, এতে অর্থনীতির হাল আরও খারাপ হতে পারে বলেই তিনি মত পেশ করেন। 

 

রাজীব চন্দ্রশেখর তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার জানান, বিশ্বের প্রতিটি দেশই তার মতো করে লকডাউন ঘোষণা করেছে। কারণ, এইন লকডাউনের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষজনের চলাফেরাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণের ছোঁয়াচে থেকে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে দূরে রাখা। করোনার প্রাদুর্ভাব দেশের বুকে ভালোমতো করে গেড়ে বসার আগেই তাই ভারতও সতর্কতা হিসাবে লকডাউন-এ গিয়েছে। কিন্তু, লকডাউনে অর্থনীতির অত্যাবশকীয় আদান-প্রদানগুলিকে বন্ধ করে রাখা হয়নি। লকডাউনের জেরে অর্থনীতির আদান-প্রদানের ৬০ শতাংশকে স্তব্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাকি ৪০ শতাংশকে আবশ্যিক পরিষেবার মোড়কে চালু রাখা হয়েছে যাতে অর্থনীতির ধাক্কাটাকে কিছুটা হলেও সামলানো যায়। তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দেন, অতিমারি পুরোপুরি দেশের উপরে চেপে বসার আগে দরকার ছিল লকডাউনের সদর্থক প্রয়োগের। সেটা নরেন্দ্র মোদীর সরকার করেছে। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক লকডাউনে শিথিলতার যেমন দরকার হয়েছে মানে আনলকের ভাবনাকেও কার্যকর করা হচ্ছে সতর্কতার সঙ্গে।  

বিজেপি সাংসদ তাঁর বক্তব্যে আরও জানান, লকডাউনের ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে পেরেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রয়োজনীয় জিনিসের আমদানি করা গিয়েছে। আর মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে লকডাউনের সফল প্রয়োগে ভারতে করোনা অতিমারি যে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে তার প্রশংসা খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও করেছে বলে তাঁর বক্তব্যে জানান রাজীব। এমনকী, রাজীব লকডাউন-এর সফল প্রয়োগের প্রসঙ্গে অতিমারিতে মৃত্যুর হারকেও হাতিয়ার করেন। তিনি জানান, ভারতে করোনা সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুস্থ হওয়া মানুষের সংখ্যা। সেই তুলনায় মৃত্যুর হার অনেক কম। 

করোনা অতিমারিকে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি বলে ব্যাখ্যা করে রাজীব জানান, এর জেরে শুধু ভারতে নয় বিশ্বের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। ব্রিটেন থেকে শুরু করে জাপান, আমেরিকা, ফ্রান্স, সকলেরই গড় বৃদ্ধির হারে বিশাল ধাক্কা লেগেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব মারাত্মকভাবে পড়েছে। কিন্তু, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০ লক্ষ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনুদান প্রকল্প প্রয়োগ করেছে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে রুগ্ন সংস্থাগুলোর পাশে দাড়াচ্ছে। এহেন পরিস্থিতির মোকাবিলা সকলকে মিলেই করতে হবে বলে জানান রাজীব। জিএসটি-তে কেন বকেয়া থাকবে- এই প্রশ্ন তুলে কেন্দ্রকে আক্রমণ করলে হবে না। কারণ, অতিমারির জেরে রাজ্যের যেমন আয়ের উৎস কমে এসেছে, কেন্দ্রীয় সরকারেরও তেমনি অবস্থা। তাই লকডাউনে আস্তে আস্তে শিথলতা এনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। যাতে অর্থনীতির চাকাটাকে ফের সচল করা যায় বলেও মন্তব্য করেন রাজীব চন্দ্রশেখর।