বেতন বৈষম্য এবং 'অন্যায্য'ভাবে বদলি হওয়া শিক্ষকদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন করছেন রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকেরা। বিধাননগরে উন্নয়ন ভবনের সামনে আমরণ অনশনে বসেছেন ১৮ জন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক। প্রায় ১০০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও সরকারের তরফ থেকে সমস্যা সমাধানে কোন সদর্থক ভূমিকা নেওয়া হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় মঙ্গলবার জানিয়েছেন শিক্ষকদের দাবি দাওয়া নিয়ে তিনি শিক্ষকদের সংগঠনের সঙ্গে কোন কথাই বলবেন না। তবে আন্দোলনরত শিক্ষকরা সমর্থন পেলেন কবি শঙ্খ ঘোষের তরফ থেকে।

শিক্ষকদের দাবি-কে সমর্থন জানিয়ে শঙ্খ ঘোষ আন্দোলন মঞ্চে এক লিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষকদের দাবিগুলি অত্যন্ত ন্যায্য এবং যথাযথ। তাঁদের আন্দোলনের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ সমর্থন রয়েছে। এই রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন অন্যান্য রাজ্যের শিক্ষকদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক - এই নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কবি। তিনি অভিয়োগ করেছেন, শিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন। তাঁর মতে, মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীকালে তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য সরকার।  

সরকারের তরফ থেকে কোন সদর্থক প্রতিক্রিয়া না মেলায় ১৮জন শিক্ষক আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বহস্পতিবার তা পঞ্চম দিনে পড়ল। শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, নাগরিক সমাজের সামনে এ এক চরম লজ্জার ঘটনা ঘটে চলেছে। তবে এরপরেও তিনি আশাবাদী, সমস্যার বাস্তবিক সমাধানের জন্য রাজ্য সরকার উদ্যোগী হবে, এবং শিক্ষক সমাজ এই অবিচার এবং বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পাবে।
 
তবে গত মঙ্গলবার সাংবাদিক সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি আন্দোলনরত উস্থি প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনায় বসবেন না। যা বলার কিছুদিনের মধ্যে নজরুল মঞ্চে শিক্ষকদের নিয়ে এক সভা ডেকেই জানাবেন। সেখানে সমস্ত পে গ্রেডের প্রাথমিক শিক্ষকরাই উপস্থিত থাকবেন বলে দাবি শিক্ষামন্ত্রীর।  

শিক্ষা মন্ত্রীর এই বক্তব্য অবশ্য মানছেন না উস্থি  প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনের তরফে পৃথা বিশ্বাস জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী বারবারই তাঁর কথার খেলাপ করেছেন। এর আগে আন্দোলনের সময় শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের গ্রেড পে-র দাবি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু গত ৫ই জুলাই বিধানসভায় তাঁদের অবাক করে শিক্ষামন্ত্রী মাত্র ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন।  

এতেই ক্ষোভ জন্মায় রাজ্যের কয়েক হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের মধ্যে। গত ১২ মে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে এই বিষয়ে বিধানসভায় দেখা করার চেষ্টা করেছিল উস্থি প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠন। কিন্তু, দরজা থেকেই তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে উস্থি ইউনাইটেড প্রাইমারি টিচার্স ওয়েলফেয়ার আস্যোসিয়েশন তার পরদিন থেকেই বিধাননগর উন্নয়ন ভবনের সামনে ওয়াই চ্যানেলে অবস্থানে বসে। সেখান থেকেই ঘোষণা করা হয় দাবি আদায়ের জন্য তাঁরা আমরণ অনশন করবেন। প্রথমে ২০ জন শিক্ষক অনশন শুরু করলেও, বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক অনশন চালাচ্ছেন। 

তবে শুদু এই একটি ক্ষেত্রেই নয়, এর আগে স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্যানেলে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে মেয়ো রোডে ২০ দিনের বেশি অনশন আন্দোলন চালিয়েছিলেন উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীরা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা রাজ্য সরকারের তরফ থেকে কেউই প্রথমে আন্দোলনকারী দের সঙ্গে সাক্ষাত করেননি। পরিস্থিতি ক্রমে জটিল আকার ধারন করলে মুখ্যমন্ত্রী বাধ্য হন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে। 

সম্প্রতি এস এস কে, এম এস কে এবং আকাডেমিক সুপারভাইজারদের যৌথ মঞ্চও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের ব্যানারে এই আন্দোলনও তীব্র আকার ধারণ করে। ৭ দিনেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলনকারীরা বিকাশ ভবনের সামনে বিক্ষোভ সংগঠিত করেন। 

বারবারই দেখা যাচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে কোন দাবিই মানছে না সরকার। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আন্দোলনের পথই বেছে নিতে হচ্ছে। অনিয়মিত এবং কম বেতনে দিনের পর দিন কাজ করে যাওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়াটাই এই রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মজীবনের রোজ নামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শঙ্খ ঘোষের এই চিঠি শিক্ষকদের এই উদ্বেগজনক অবস্থাটাই তুলে ধরল।