মানুষকে বিশ্বাস করে তার এগিয়ে দেওয়া বাজি-ভরা আনারস খেতে গিয়েছিল হাতিটি। আর তারপরই বিস্ফোরণে তৈরি হয়েছিল মুখে গভীর ক্ষত। সেই ক্ষত নিয়ে না পারছিল খাবার খেতে না পারছিল খেতে জল। গর্ভে শিশুকে নিয়ে এভাবেই কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্ত্রণা সহ্য করে অবশেষে মৃত্য়ুতে মুক্তি পেয়েছে সে। কেরলের এই নক্কারজনক ঘটনা সামনে আসতেই গোটা দেশের মানুষ প্রশ্ন করছে ঠিক কতটা অধঃপতন ঘটলে মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে?

একই সঙ্গে দেশের মানুষ দাবি করছে দোষীদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তির। কেউ কেউ এক কদম এগিয়ে গিয়ে দাবি করছেন দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের। পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী রাজীব বিশ্বাসই এই দাবি তুলেছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমনটা আর কেউ না করে। কিন্তু, সত্যিই কি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সম্ভব কেরলের এই মানুষের চেহারায় লুকিয়ে থাকা রাক্ষসদের? দেখা যাক এই বিষয়ে প্রাণী সুরক্ষা আইন কী বলছে।

সংবিধানের ৫১-র ক ধারায় পশুদের অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে বন্যপ্রাণ রক্ষা এবং বণ্যপ্রাণীদের প্রতি সমবেদনা প্রদর্শন সকল নাগরিকের কর্তব্য। সেখানেই কেন্দ্র এবং রাজ্য দুই সরকারের হাতেই পশু নির্যাতন রোধ এবং বন্যপ্রাণী এবং পাখি সুরক্ষার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পশুর নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য রয়েছে ১৯৬০ সালের প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েল্টি টু অ্যানিমাল অ্যাক্ট, বা পশু নির্যাতন রোধ আইন। এই আইনের লক্ষ্য প্রাণীদের অহেতুক যন্ত্রণা দেওয়া বন্ধ করা। এছাড়া রয়েছে ১৯৭২ সালের বন্যজীবন সংরক্ষণ আইন, যা শুধু বন্যপ্রাণী নয়, তার সঙ্গে সঙ্গে পাখি ও গাছপালারও সুরক্ষা দেয়।

কেরালে এমনিতে বহু বাড়িতেই হাতি পোষা হয়। কেরলের সংস্কৃতির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে হাতি। তবে মৃত গর্ভবতী হাতিটি গৃহপালিত নয়, সে এসেছিল মলপ্পুরমের সাইলেন্ট ভ্যালি ফরেস্ট থেকে। ১৯৬০ ও ১৯৭২ - দুই আইন ঘেঁটেই দেখা যাচ্ছে এই ধরণের অপরাধের জন্য আসামিরা সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের সাজা পেতে পারেন।

এই আইনের বয়ানে বলা হয়েছে, কোনও বন্যপ্রাণীকে ধরা, কিংবা বিষ খাওয়ানো, ফাঁদে ফেলা, অন্যকোনও বন্যপ্রাণীকে দিয়ে খাইয়ে দেওয়ার মতো দোষ করলে বা সেইরকম কিছু করার চেষ্টা করলেও, আসামীদের ২৫,০০০ হাজার টাকা জরিমানা বা সাত বছরের জেল বা উভয় দণ্ডই দেওয়া যেতে পারে।

কিন্তু, কেরলের ঘটনার বীভৎসতা আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মা এবং তাক অনাগত শিশুর এই মর্মান্তিক পরিণতিতে আশা করা হচ্ছে আসামীদের পশু সুরক্ষা আইনের সর্বোচ্চ সাজাই দেওয়া হবে। কিন্তু যে ধরণের পৈশাচিক অপরাধ করা হয়েছে তাতে সাত বছরের জেল ও ২৫০০০ টাকা জরিমানাই যথেষ্ঠ কিনা সেই প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। নির্ভয়া কাণ্ডের পর যেমন দেশের ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনে সাজায় বড় রদবদল আনা হয়েছে, তেমনই এই নক্কারজনক ঘটনার পর পশু সুরক্ষা আইনের সাজাও বদলানোর দাবি উঠেছে। শেষ পর্যন্ত কেরলের হতভাগ্য মা হাতিটি নির্ভয়া হয়ে উঠতে পারে কিনা, পশু সুরক্ষা আইনের সাজা পাল্টে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের সাজা আসে কি না, সেটাই এখন দেখার।