রাতারাতি জারি করা হয়েছিল জরুরি অবস্থা। ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে দেশের মানুষের  স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। প্রায় ২১ মাস জারি ছিল এই জরুরি অবস্থা। কিন্তু এই সময়টা একটি বিশেষ ভূমিকায় দেখা গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘকে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের কথায় ইন্দিরা সরকারের সঙ্গে স্নায়ু যুদ্ধ চলেছিল তৎকালীনা স্বয়ংসেবকদের। কারণ নানাভাবে সংঘের কর্মীদের হেনস্থা করা হত। জেলে পুরতেও পিছপা হত না সরকার। কিন্তু হাল ছাড়েনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ। লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে। 

তৎকালীন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রধান লক্ষ্য় ইন্দিরা গান্ধী বা কনোও রাজনৈতিক দল বা কোনও নেতা ছিল না। সেই সময় আরএসএস লড়াই চালিয়েছিল দেশের মানুষকে স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে মুক্ত করতে। ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে সবথেকে বড় আন্দোলন শুরু করেছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। গুজরাত ছিল এই আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। জয় প্রকাশের নেতৃত্বে বিহারের শুরু হয়েছিল আন্দোলন। এই জয়প্রকাশ নারায়ণকে সবরকমভাবে সহযোগিতা করতেই এগিয়েছিল আরএসএস। জয়প্রকাশের নেতৃত্বে আন্দোলন যখন দানাবাঁধছে তখনই ইন্দিরা গান্ধী আরএসএসকে ব্যান করার চিন্তাভাবনা করছিলেন। সেইমত এসএস রায়কে একটি খসড়া তৈরির নির্দেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু এই খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তা থেকে বিরত থাকেন গান্ধী। কিন্তু জরুরি আবস্থা ঘোষণার পরই ব্যান করা হয় আরএসএসকে।  তারপর থেকেই ইন্দিরার সঙ্গে আরএসএস-এর দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরেই আরএসএস নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করেছিল ইন্দিরা সরকার। অনেকের বিরুদ্ধে মিশা আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। নাগপুর রেল স্টেশন থেকে ভাওরাও দেওয়ারকে গ্রেফতার করে পাঠান হয়েছিল পুনের ইয়াওয়াড়া জেলে। সেই সময় এই জেলের অধিকাংশ বন্দি ছিল আরএসএস-এর সমর্থক। 

এতকিছুর পরেও হাল ছাড়েনি আরএসএস। লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই সময়ই আরএসএস-এর শক্তি রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছিল ইন্দিরা গান্ধীকে। ঘনিষ্ট মহলে তিনি বলেছিলেন এখনও পর্যন্ত ১০ শতাংশ স্বয়ং সেবক কর্মী ও সমর্থকদের গ্রেফতার করা হয়নি। অধিকাংশই রয়েছে গাঢাকা দিয়ে। তাঁরা সংঘের কার্যকলাপও চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আরএসএস-এর উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সত্যাগ্রহ। পাশাপাশি  রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারকে অর্থ সাহায্যের জন্য টাকাও তুলেছিল এই সংগঠন। 

এরপরই আরএসএস সত্যাগ্রহে সামিল হয়। কয়েক হাজার স্বয়ংসেবক সত্যাগ্রহে সামিল হয়। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের জরুরি অবস্থা যে কতটা ক্ষতিকারক তা বোঝাতে রাস্তায় নামে। ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরচারী শাসনের পথে যা রীতিমত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৪ নভেম্বর  ১৯৭৫ থেকে ১৪ জানুয়ারি ১৯৭৬ পর্যন্ত একটানা সত্যাগ্রহ চলে। সেই সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির দাবিতে সরব হয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। আরএসএস-এর পর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতেও সরব হয়েছিল সংঘের কর্মীরা। তৎকালীন দলীয় নেতাদের কথায় 
জয়প্রকাশ নারায়ণ আর আরএসএস গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্রের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 


আরএসএস-এক অধিকাংশ নেতাই তখন হয় জেলবন্দি নয়তো লুকিয়ে রয়েছেন। কিন্তু এই অবস্থাতেও জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করে গিয়েছিল সংঘ। কিন্তু জেলে বন্দি অবস্থায় থেকেও জরুরি অবস্থা বিলোপের জন্য সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আরএসএস প্রধান ভাওরাও। তিনি জেলে থেকে ইন্দিরা গান্ধিকে উদ্দেশ্য করে একের পর এক চিঠি লিখেছিলেন। তিনি প্রথম চিঠিটি লেখেন ১২ অগাস্ট ১৯৭৫-এ। যেখানে আরএসএস-এর বিরুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর তোলা সব অভিযোগ খণ্ডন করেন। আরএসএসকে নিষিদ্ধ করা নিয়েই তিনি এক হাত নেন। পাশাপাশি জয়প্রকাশ নারায়ণের পক্ষেও সওয়াল করেন। জয়প্রকাশ নারায়ণকে দেশদ্রোহী বা সিআইএ এজেন্টের তকমা দেওযার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। তাঁর কথায় জয়প্রকাশ নায়ারণ একজন স্বাধীনতা সংগ্রমী। তাঁর দ্বিতীয় চিঠিটির তারিখ ছিল এই বছরেরই ১০ নভেম্বর। যেখানে তিনি দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিয়ে সওয়াল করেন। পরের বছর ১২ জানুয়ারিতেও তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠি লিখে পাঠান। যেখানে তিনি সংঘের বিরুদ্ধে তোলা সব অধিকার খণ্ডন করেন। 

তারপরই ধীরে ধীরে তৈরি হয় জনতা পার্টি। আর এই রাজনৈতিক দল গঠনের ক্ষেত্র রীতিমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন সংঘের নেতা কেএস সুদর্শন আর নানজি দেশমুখ। জরুরি অবস্থার সময় গুজরাতে ইন্দিরা সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমত সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই সময় তিনি সংঘের সদস্য ছিলেন।