"গুলি ঢুকেছিল মাথা ফুঁড়ে আর বেরিয়ে গিয়েছিল বাঁ-চোখ বিঁধে। তবু ধুকপুক করতে করতেও বেঁচে গিয়েছে প্রাণটা। সেটাই বা কম কীসের?"  বলছিলেন মহম্মদ নাসির খান।

দিল্লির সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের জীবন্ত দগদগে ক্ষতি নিয়ে বেঁচে রয়েছেন নাসির খান। 'বেঁচে রয়েছেন' বলা বোধ হয় ঠিক হল না। বলা ভাল, বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছেন। সোমবার নাসিরকে দেখা গেল মাথায় ব্য়ান্ডেজ বাঁধা অবস্থায়। চোখ থেকে কান পর্যন্ত সেলাই। এক চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও নিজেকে 'ভাগ্য়বান' মনে করছেন উত্তর ঘোন্ডার এই যুবক! কারণ, প্রাণটাতো বেঁচে গিয়েছে।

সোমবার দিল্লিতে একটি জন-আদালতের আয়োজন করেছিল অ্য়ামেনেস্টি ইন্টারন্য়াশানাল, অনহদ, আমন বিরাদরির মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলি। সেখানে দিল্লির সংঘর্ষে ক্ষত-বিক্ষত মানুষগুলো এসেছিলেন তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শোনাতে। সেখানে সংঘর্ষে আক্রান্তরা তাঁদের 'জবানবন্দি' দিলেন। আর সেখানে তিরিশজনের জবানবন্দি শুনে নাসিরকে বেশ 'ভাগ্য়বান'ই তো মনে হল।

কী ঘটেছিল সেদিন?

দিনটা ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি। মহল্লায় ঝামেলার খবর পেয়ে অ্য়াপ-ক্য়াবে করে তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরছিলেন নাসির। হাওয়া খারাপ বুঝে চালককে নিজের বাইকে বসে এগিয়ে দিতে গিয়েছিলেন।  ফেরার পথে আচমকাই তাঁকে ঘিরে ধরে হেমমেট পরা একদল দুষ্কৃতী। কোথা থেকে যেন শুরু হয়ে যায় এলোপাথাড়ি গুলি। মাথা ফুঁড়ে বাঁ-চোখ বিঁধে বেরিয়ে যায় গুলি।

যদিও এরপরও প্রাণে বেঁচে যান নাসির। তাঁর জবানবন্দিতে নাসির বলছিলেন, "হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই পাঁচ লিটার রক্ত বেরিয়ে যায়। তারপরও যে ধুকপুক করে বেঁচে রয়েছি এই-বা কম কীসের?" বাঁ-চোখে আর দেখতে পান না নাসির। গোটা শরীরে দগদগে ক্ষতের ছাপ স্পষ্ট।  বলতে গেলে, তরতাজা এই যুবকের দিকে তাকাতেই রীতিমতো অস্বস্তি হয়।

সুভাষ বিহারের হারুণ আলি ২৫ ফেব্রুয়ারি বাড়িতে বসেই খবর পান, গুলি লেগেছে তাঁর ছোট ভাই মাহরুখের চোখে। তখন মোড়ে-মোড়ে চলছে স্লোগান। রাস্তায় এলোপাথাড়ি  ছোড়া হচ্ছে পাথর আর চারপাশে আগুন। বহু চেষ্টা করেও তাই অ্য়াম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি।  এই অবস্থায়  ছোট ভাই মাহরুখকে স্কুটারে চড়ে হাসপাতালে নিয়ে যান হারুণ । কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি।

কদরপুরীর হস্তশিল্প ব্য়বসায়ী মহম্মদ ইমরান ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুকে দেখা করে এসেছিলেন তাঁর ছোট ভাই ফুরকানের সঙ্গে। বিকেলে হঠাৎ খবর পান, ফুরকানের বাঁ-পায়ে গুলি লেগেছে। প্রথমে অবিশ্বাস্য় মনে হয়েছিল। ফুরকানকে আর বাঁচানো যায়নি। পাঁচ বছরের ছেলে, আড়াই বছরের মেয়ে আর অন্তসত্ত্বা স্ত্রীকে ফেলে রেখে চলে চিরঘুমে চলে গেলেন এই যুবক।