কানপুরের আট পুলিশ কর্মী হত্য়াই ছিল তার শেষ অপরাধ। অবশ্য তার আগে রয়েছে তিন দশকের বিভীষিকা। ৬০টিরও বেশি মামলায় অভিযুক্ত কানপুরের দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার বিকাশ দুবের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু, তারপর থেকেই তার মৃত্য়ুর ঘটনা নিয়ে জোর রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক শুরু হয়েছে। সত্যি সত্যিই পুলিশের দাবি মতো পালানোর চেষ্টা করায় তাকে মরতে হল, নাকি কোনও রাঘব বোয়ালকে বাঁচাতে তাকে ভুয়ো এনকাউন্টারে মারা হল, তাই নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

আত্মরক্ষায় গুলি চালায় পুলিশ

কানপুরের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, বৃষ্টিভেজা পিছল রাস্তায় পুলিশের গাড়িটি উল্টে যায়। গাড়িতে থাকা চার পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের একজনেরই পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল বিকাশ দুবে। এরপর তাকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। তাকে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়। কিন্তু, জবাবে গুলি ছুড়তে শুরু করেছিল এই কুখ্যাত মাফিয়া। তাতেই আত্মরক্ষায় গুলি চালায় পুলিশ। গুরুতর জখম হয় বিকাশ।

আর জানা যাবে না কোনও যোগসূত্র

বৃহস্পতিবারই কংগ্রেস নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ দিগ্বিজায় সিং, অভিযোগ করেছিলেন বিকাশ দুবের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। তারাই আগে তাকে রক্ষা করেছে, এখন তারাই তার মুখ বন্ধের জন্য হত্যার চেষ্টা করছে। এদিন তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর দিগ্বিজয় জানিয়েছন, 'ঠিক আমরা যা সন্দেহ করছিলাম, এখন তাই ঘটল। বিকাশ দুবে যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পুলিশ এবং অন্যান্য আধিকারিকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের কথা এখন আর জানা যাবে না।'

তাদের কী হবে

একই সুরে রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে বিকাশ দুবের যোগসূত্রের অভিযোগ তুলেছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও। আগেই তিনি এই ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছিলেন। বিকাশ দুবের মৃত্যুর পর তিনি টুইট করে জিজ্ঞেস করেছেন, 'অপরাধী মারা গিয়েছে, কিন্তু যারা অপরাধীকে সহায়তা করেছিল তাদের কী হবে?'

গাড়িটা উলটে যায়নি, সরকারকে বাঁচিয়েছে

সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের গলাতেও কংগ্রেস নেতাদের মতোই ষড়যন্ত্রের অভিযোগের সুর শোনা গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিকাশ দুবের মৃত্যুর পর বলেছেন - 'আসলে এই গাড়িটা উলটে যায়নি, গোপন কথা ফাঁস হয়ে উলটে যাওয়া থেকে সরকারতে বাঁচিয়েছে।'

সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে চাই সিবিআই তদন্ত

বহুজন সমাজবাদী পার্চির নেত্রী তথা উত্তরপ্রদেশের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী বিকাশ দুবের 'দুর্ঘটনা ও এনকাউন্টারে' মৃত্যুর বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

মৃত মানুষ গল্প বলে না

বিকাশ দুবের মৃত্যুতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং ততটাই তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহ। এদিন জম্মু ও কাশ্মীরের এই নেতা টুইট করে বলেন, 'মৃত মানুষ কোনও গল্পই বলে না'। হ্যাশট্যাগ বিকাশ দুবে দিয়ে স্পষ্টতই তিনি বিকাশের সঙ্গে শক্তিশালী রাজনীতিবিদ ও পুলিশ কর্মকর্তাদের জোটের অভিযোগের ইঙ্গিত করেছেন।

বাঁশি বাদক না থাকলে বাঁশিও বাজবে না

শিবসেনা নেতা তথা মহারাষ্ট্র থেকে রাজ্যসভার সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদি সরাসরি না বলে ইঙ্গিতে এই এনকাউন্টারের পিছনে বিকাশ দুবের মুখ বন্ধ করার যড়ষন্ত্রের অভিযোগই তুলেছেন। তিনি বলেন, "বাঁশি বাদক না থাকলে, বাঁশিও বাজবে না।"

পুলিশ-আদালত সবাই বিভ্রান্ত

বিকাশ দুবে-র মৃত্যু নিয়ে সরাসরি বিজেপিকে আক্রমণ করেচেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র। টিএমসির নেত্রী বলেছেন, বিজেপির অধীনে পুলিশ, আদালতর এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠাগুলি কাজ করা ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।

ঘটনাক্রম নিয়ে প্রশ্ন

কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা আবার বিকাশ দুবেকে হত্যার পূর্ববর্তী ঘটনাক্রম নিয়ে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

পুলিশকে অভিনন্দন, কিন্তু রয়েছে প্রশ্নও

গ্যাংস্টার বিকাশ দুবের হত্যার জন্য উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিশিষ্ট বিজেপি নেত্রী উমা ভারতী। তবে সেইসঙ্গে প্রশ্নের কাঁটা বেঁধাতেও ছাড়েননি।

আইন তার নিজের পথে চলেছে

মধ্যপ্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিশিষ্ট বিজেপি নেতা নরোত্তম মিশ্র অবশ্য দাবি করেছেন, বিকাশ দুবের মৃত্যুতে 'আইন তার নিজের পথে চলেছে'। বিরোধীদের একহাত নিয়ে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকাশ দুবে-র গ্রেফতারি এবং এদিন তার মৃত্যু নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা দুঃখ ও হতাশা থেকেই তা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের হেফাজতে বিকাশের মৃত্য়ুর দায় কোনওভাবেই তিনি ঘাড়ে নিতে চাননি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রদেশ  পুলিশ তার কাজ করেছে। বিকাশকে গ্রেফতার করে ইউপি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। তারপর সে কীভাবে মারা গেল তা উত্তরপ্রদেশ পুলিশই বলবে।

উত্তরপ্রদেশ পুলিশের জন্য গর্বিত

কানপুরের বিক্রু গ্রামে গত ২ জুলাই বিকাশের দলবলের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্য়ু হয়েছিল আট পুলিশকর্মী। সেই নিহতের তালিকায় থাকা কনস্টেবল জিতেন্দ্র পাল সিং-এর বাবা এদিন বলেছেন, উত্তরপ্রদেশ পুলিশ যাই করে থাকুক, তাতে তাঁর পুত্রের 'আত্মা শান্তি পেয়েছে'। আর তাই তিনি 'উত্তরপ্রদেশ পুলিশের জন্য গর্বিত'।