২০০৮ সালে মুম্বইয়ে হামলা চালিয়েছিল পাকিস্তান সমর্থিত সন্ত্রাসবাদীরা। এই ঘটনায় চুড়ান্ত ব্যথিত হয়ে ভারত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। সেই কারণে, তৎকালীন জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা এম কে নারায়ণন সমস্ত নিরাপত্তা ও গুপ্তচর বিভাগের প্রধানদের তলব করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, পাক অধিকৃত কাশ্মীর বা পিওকে-তে পাল্টা আক্রমণ করে উপযুক্ত জবাব দেওয়া সম্ভব কিনা। তাদের কাছ থেকে নেতিবাচক জবাব পেয়ে জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা এই বিষয়ে একটি বিশেষ দল তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২০১০ সালে সেইসময়ের ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল আর কে লুম্বা সেনাপ্রধান জেনারেল ভি কে সিং-এর এই প্রস্তাবটি সমর্থন করেছিলেন। জেনারেল লুম্বা, কর্নেল হানি বকশি-কে এই ধরমের একটি ইউনিট গঠন ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। কর্নেল হানি বকশি-র হাত ধরে এই বাহিনি গড়ে উঠতে খুব বেশি সময় নেয়নি। কর্নেল বকশি, কর্নেল বিনয় বি, কর্নেল সর্বেশ ডি ওআরও কয়েকজন মিলে প্রযুক্তিগত সহায়তা বিভাগ বা টিএসডি গঠন করেছিলেন।

টিএসডি অত্যন্ত সফল হয়েছিল। পাক সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোয় ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল তারা। নিয়ন্ত্রণরেখা ববারবর আইইডি বিস্ফোরক লাগানো-সহ অনেক গোপন কার্যক্রম তারা পরিচালনা করেছিল। আইএসআই-এর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীরে মোটামুটি শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল।

শান্তি যেই ফিরে এসেথছিল, জেনারেল ভি কে সিং অভিযোগ করেছিলেন, ট্রাক কেনার জন্য তাঁকে ১৪ কোটি টাকা ঘুষ দিতে চাওয়া হয়েছে। এমনকী তিনি তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে অ্যান্টনির কাছে এই নিয়ে অভিযোগও করেছিলেন। কিন্তু, অ্যান্টনি তাঁকেই দোষারোপ করে বলেছিলেন, তিনি বিষয়টি অনুসরণ করেননি।

জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান তেজিন্দর সিং-ই ভি কে সিংকে ঘুষের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকী, তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টাও করেছিলেন এবং টিএসডি থেকে গোপন তথ্য পেতে শ্যাম দাস নামে এক কেরানি-কেও ঘুষ দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে ছিল কিছু ঘুষখোর সংবাদমাধ্যম, যারা জেনাররেল ভি কে সিং-এর বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

গণমাধ্যমগুলি অন্যের বিষয়ে নাক গলানো এবং তাত্রা ট্রাক সম্পর্কিত ঘুষের অভিযোগেও মনোনিবেশ করেছিল। এর মধ্যে, তেজিন্দর সিং টিএসডি-তে ঢুকে পড়েছিলেন, অভিযোগ যার পিছনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল।

খ্যাতনামা সাংবাদিক শেখর গুপ্ত, এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে এমন কথাও বলেছিলেন।

এই খবর দেশের রাজনীতিবিদদের খুব বিচলিত করেছিল। তর ওপর, টিএসডি যেভাবে কাজ করেছে তাতে তারা খুশি ছিল না। তাদের গোপনীয়তা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস শাখার চেয়েও বেশি গোপন ছিল।

টিএসডি সীমান্তে ফোন ট্যাপ করতে পারে। রাজনীতিবিদরা ভেবেছিলেন যে তাদের কথাবার্তাও সহজেই প্রকাশিত হতে পারে।

সুতরাং, এরপরে নেমে এসেছিল অভিযোগের তাড়া।

১. অভিযোগ করা হয়েছিল ওমর আবদুল্লার নেতৃত্বাধীন জম্মু ও কাশ্মীর সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য টিএসডি অর্থ ব্যবহার করেছে। অভিযোগ করা হয়েছিল টিএসডি-ই ওমর আবদুল্লা সরকারকে অস্থিতিশীল করেছে।

২. পরবর্তী সেনা প্রধানের বিরুদ্ধে টিএসডি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। সেই জমস্বার্থ মামলায় অভিযোগ করেছিল যে ২০০১ এর যে সংঘর্ষের জন্য বিক্রম সিংকে বীরত্বের পদক দেওয়া হয়েছিল সেই সংঘর্ষটি ছিল নকল। আদালত সেই অভিযোগ খারিজ করে এবং বিক্রম সিং-এর সেনাপ্রধান হওয়ার পথ পরিষ্কার করে দেয়।

কে সেনাবাহিনীকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছিল?

৩.তাত্রা ট্রাক ঘুষ কেলেঙ্কারি উঠে এসেছিল। তখনও অবধি সেটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং ভি কে সিংহের মধ্যেই ছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক প্রতিবেদক-কে সঙ্গে নিয়ে তেজিন্দর সিং টিএসডি-তে অনুপ্রবেশের চেষ্টার পর টিএসডি-ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।

বলা হয়ে থাকে টিএসডি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উইট-হান্ট শুরু হয়েছিল, তাদের শাস্তিমূলক পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল।

এখানেই তা থামেনি। একটি তদন্তে দেখা গিয়েছিল ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলিতে টিএসডি ৮টি অপারেশন করেছিল। তদন্ত পরিচালনা করেছিলেন লেফট্যানেন্ট জেনারেল বিনোদ ভাটিয়া। তবে তাঁর অনুসন্ধানের একটি অংশ কীভাবে গণমাধ্যমের কাছে ফাঁস হয়েছিল তা অবাক করা বিষয়।

সেই বাছাই করা ফাঁস-এর ফলে  পাকিস্তান নিজেদের ভুক্তভোগী দাবি করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখাটি বাতিল হয়ে যায়।