ইতালির চিকিৎসকরা করোনভাইরাস সংকট সম্পর্কে জেনে ফেলেছেন গোপন তথ্য। ফাঁস হয়ে গিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লুএইচও) ষড়যন্ত্র। ফলে ইতালি এখন তাদের নির্দেশিকা আর মানছে না। অন্তত, সোশ্যাল মিডিয়ায় সাড়া ফেলে দেওয়া একটি দীর্ঘ নিবন্ধ তাই বলছে। সেখানে এই রোগ, তার চিকিত্সা, রোগটির প্রকৃতি, এর উত্স এবং এই রোগজনিত কারণে মৃত্যু বিষয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। নিবন্ধের দাবি কোভিড-১৯ আসলে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানোর জন্য 'হু'-এর একটি ষড়যন্ত্র।

নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে করোনভাইরাস বলা হচ্ছে যাকে, সেটি আসলে কোনও ভাইরাসই নয়, এটি আসলে একটি ব্যাকটিরিয়া। ফলে রোগীদের চিকিত্সার জন্য আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর-এর মতো ব্যয়বহুল ব্যবস্থার কোনও প্রয়োজনই আসলে নেই,  সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধেই সেড়ে যেতে পারে কোভিড-১৯ রোগ। আরও বলা হয়েছে কোভিড-জনিত কারণে যে মৃত্যু হচ্ছে তার প্রধান কারণ নিউমোনিয়া নয়, মৃত্যুর আসল কারণ হল থ্রম্বোসিস বা রক্ত ​​জমাট বেঁধে যাওয়া।

এই নিবন্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়েছে। অনেকেই এই নিবন্ধ পড়ে বিভ্রান্ত, তাহলে কি সত্যিই বিশ্বজোড়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্তার মতো রাষ্ট্রসংঘের অধীনস্থ সংস্থা? এই প্রশ্ন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে নেটিজেনদের। বিপর্যয়ের সময় মানুষের এই বিভ্রান্তি দূর করতে এই ভাইরাল হওয়া নিবন্ধের দাবিগুলি সত্যি না ভুয়ো তা যাচাই করে দেখল এশিয়ানেট নিউজ বাংলা। নিচে এক এক করে এই নিবন্ধে থাকা চাঞ্চল্যকর দাবিগুলি ও আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য তুলে ধরা হল।

প্রথম দাবি - করোনাভাইরাস কোনও ভাইরাস নয়, ব্যাকটিরিয়া। প্রদাহরোধী ওষুধ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমেই কোভিড-১৮ রোগ নিরাময় হতে পারে।

সত্যি - করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিযুক্ত ডাক্তাররা এবং এই বিষয়ে গবেষণা করা হগবেষকরা একযোগে এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। জীবানুটির জিনোমিক বৈশিষ্ট্যই বলে দিচ্ছে এটি ভাইরাস, বলছেন তাঁরা। কাজেই অ্যান্টিবায়োটিক, যা কিনা কেবল কোনও রকম ব্যাকটিরিয়া-জনিত সংক্রমণ রোধ করতে পারে, তা দিয়ে করোনা মোকাবিলা সম্ভব নয়। তবে করোনার সঙ্গে সঙ্গে গৌন ব্যাকটিরিয়া-ঘটিত সংক্রমণ যাদের হচ্ছে, সেইসব কোভিড রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয় দাবি - কোভিড-১৯'এ মৃত্যুর আসল কারণ হল থ্রম্বোসিস বা রক্ত ​​জমাট বেঁধে যাওয়া। নিউমোনিয়া নয়।

সত্যি - বেশ কয়েকটি প্রথম সারির মেডিকাল জার্নাল এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র অনুসারে, থ্রম্বোসিস বা রক্তের জমাট বাঁধার ঘটনা কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রে গভীর জটিলতা সৃষ্টি করেছে। নেদারল্যান্ডস এবং ফ্রান্সে আশঙ্কাজনক কোভিড-১৯ রোগীদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা গিয়েছে। এই নিয়ে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। ভারতে এই বিষয়ে এখনও কোনও গবেষণা না হলেও দেখা গিয়েছে কোভিড-১৯ রোগীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা, মাল্টিঅর্গান ফেলিওর বা একসঙ্গে বহু-অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া এবং রেনাল শাটডাউন রেচনতন্ত্রে কার্যক্ষমতা হারানো। থ্রম্বোসিস-এর কারণে মৃত্যুর হার ২০ শতাংশেরও কম। অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট ড্রাগ বা রক্ত জমাটবাধা রোধী ওষুধে করোনভাইরাস সেড়ে যাবে, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যাদের ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধতে থাকে, তাদের এই ধরণে ওষুধ দেওয়া হয়। কারণ হিসাবে দেখা গেছে।

তৃতীয় দাবি - কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ভেন্টিলেটর এবং আইসিইউ'এর কোনও প্রয়োজন নেই।

সত্যি - চিকিৎসক ও গবেষকরা জানাচ্ছেন, সমস্ত করোনাভাইরাস রোগীদের আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর প্রয়োজন হয়, এমনটা নয়। বরং বেশিরভাগ রোগীর  ক্ষেত্রেই এইসব প্রযুক্তিগত সমর্থন লাগে না। কারণ করোনার ৮০ শতাংশ রোগীই উপসর্গহীন। একমাত্র যেসব রোগীদের শ্বাসযন্ত্রের গুরুতর অসুস্থতা বা একসঙ্গে বহু-অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া বা রেচনতন্ত্রে কার্যক্ষমতা হারানোর মতো জটিলতা দেখা যায়, তাদেরই আইসিইউ-তে চিকিৎসা করা হয় এবং ভেন্টিলেটরের সাহায্য দেওয়া হয়।

তাহলে কোথা থেকে এইসব অদ্ভূত দাবি তৈরি হল?

এশিয়ানেট নিউজ বাংলা বিপরীত তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছে এই নিবন্ধটি 'ইফোগেটর ডটকম' নামে  একটি নাইজেরিয়ান ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিল। এই ওয়েবসাইটটি আজগুবি, ভিত্তিহীন সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশের জন্য সুপরিচিত। এমনকি সাইটটির পরিচালকরা নিজেরাই স্বীকার করেছে, বিষয়বস্তুতে কোনও ত্রুটির দায় তারা নেবে না। অর্থাৎ এই ভাইরাল নিবন্ধের উৎসটি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য বা নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং, স্পষ্টভাবে বলা যায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিষয়ে এই ভাইরাল নিবন্ধের দাবিগুলি একেবারে ভুয়ো।