আত্মপ্রকাশ ও সংস্কৃতির প্রসারে ভাষাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার অধিকাংশ সাহিত্যিক ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষাকে ব্যবহার করায় আফ্রিকার নিজস্ব ভাষা অবহেলিত বলে অভিযোগ করেছিলেন সাহিত্যিক ও তাত্ত্বিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গে। তিনি নিজেও শুরু করেছিলেন ইংরেজিতে, তবে পরবর্তীতে নিজের ভাষায় চর্চা করেন। অন্যদিকে যিনি তাঁর ঔপনিবেশিকতাবিরোধী মনোভাবের জন্য বিশ্বসাহিত্যে সুপরিচিত সেই চিনুয়া আচেবে ঔপনিবেশিক ও নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যা কিছু বলেছেন তা বিদেশি ভাষা ব্যবহার করেই। ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনার কারণ হিসাবে বলেন, ইংরেজি ভাষার মধ্য দিয়ে আফ্রিকান সাহিত্য এবং সমাজকে সহজেই সারা বিশ্বে হাজির করা যায়, কারণ ভাষাটি গোটা বিশ্বের যোগাযোগ মাধ্যম।
তবে ছোটবেলা থেকে কিন্তু চিনুয়া আচেবেকে তাঁর নিজের ভাষার বদলে বিদেশি ভাষা চর্চা করতে বাধ্য করা হয়। স্কুলে তাঁর উপরে ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়। স্কুলটি নিয়ন্ত্রণ করত ঔপনিবেশিক শাসক। স্কুলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক ভাবাদর্শের প্রসার। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে দমন করা। ওই স্কুলে ইংরেজির বদলে স্থানীয় ভাষায় কথা বলা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। স্থানীয় ভাষা ব্যবহারের জন্য তাঁকে স্কুলজীবনে একবার শাস্তি পেতে হয়েছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক মিশনারিরা যখন খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করত তখন তাঁরা আফ্রিকার আঞ্চলিক ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করত।
এক সময় চিনুয়া আচেবে লক্ষ করলেন; তিনি ক্রমশ আফ্রিকাবিদ্বেষী হয়ে উঠছেন। উপন্যাস ও বিভিন্ন গল্পের ঔপনিবেশিক প্রভুরাই তাঁর নায়ক হয়ে উঠছেন। তিনি কালো মানুষদের প্রতি যেন একটু হলেও বিদ্বেষী হয়ে উঠছেন। তাদের পরিবার গোড়াতে খ্রিস্টান ছিল না। আচেবের বাবা পরবর্তীকালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি খ্রিস্টান এবং অ-খ্রিস্টানদের বিভেদ দেখেছেন। একটা সময় তিনি খ্রিস্টান হিসেবে নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করতেন, অন্যদের হেয় জ্ঞান করতেন, তাঁদেরকে ‘পৌত্তলিক’ হিসেবে অভিহিত করতেন।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তার ধ্যান ধারণার পরিবির্তন ঘটতে থাকে। তিনি বুঝতে পারেন ঔপনিবেশিক প্রভুরা তাদের বর্ণবাদী চিন্তা-চেতনা দিয়েই আফ্রিকাকে অমানবিক গড়ে তুলছে। তাঁর ধর্মান্তরিত হওয়ার সময়কার নাম ‘আলাবার্ট চিনুয়ালুমোগু’ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ক্রমেই তিনি পশ্চিমী সংস্কৃতির আধিপত্য ও ঔপনিবেশিক বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। 

১৯৯০ সালে যখন আচেবর There was a country বইটি প্রকাশিত হল, তখন তাঁর মাতৃভূমি নাইজেরিয়া সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট। জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তথাকথিত নির্বাচিত সরকার স্বাধীনতার মাত্র ছ’বছরের মাথায় ব্যর্থ হল। এর পরও দুবার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নাইজেরিয়া সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে আটকা পড়ল। নাইজেরিয়া দুর্নীতি, নির্বাচনে অবাধ কারচুপি, বিভিন্ন রাজনীতিকদের অদক্ষতা, নাইজেরিয়াবাসীর আশা-আকাঙক্ষার গতিপ্রকৃতি বুঝতে না পারার ব্যর্থতায় তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটল। তখন চিনুয়া আচেবে তাঁর লেখা বইতে নাইজার নদীর ভাটি অঞ্চলে ঔপনিবেশিকদের ফেলে যাওয়া নানা উপষঙ্গের ইতিবাচক দিক ও প্রাসঙ্গিকতার কথা লিখলেন। এতে অনেক সমালোচক তাঁর ঔপনিবেশিকতাবিরোধী মনোভাব বা অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললেন।
তবে তাঁর Things Fall Apart প্রকাশিত হয় নাইজেরিয়ার স্বাধীনতার দু’বছর আগে, ১৯৫৮ সালে। ইংরেজি ভাষায় লেখা আফ্রিকার সাহিত্য, তবে সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে স্থানীয় ইগবো ভাষা, ইগবো প্রবাদপ্রবচন, কল্পচিত্র, ঐতিহ্য, আচরণ ও বিশ্বাস। আচেবের আগেই বেশ কয়েকজন আফ্রিকার লেখক ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু আচেবের Things Fall Apart প্রকাশিত হওয়ার পরই আফ্রিকার সাহিত্য বিশ্বের পাঠক মহলের মনোযোগে আসে। কারণ আচেবের এই উপন্যাসটি আফ্রিকাকে অনেক গভীর থেকে তুলে আনে।
ঔপনিবেশিক যুগ থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকা, এমনকি নয়া ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ছবি ফুটে উঠেছে আচেবের No Longer at Ease, Arrow of God, A Man of the People, Anthills of the Savannah লেখাগুলিতে। লেখাগুলিতে ইউরোপীয় ও আফ্রিকান সংস্কৃতির টানাপড়েন, আত্মপরিচয়ের-সংকট, বা নিজস্ব থেকে কীভাবে অন্যতে স্থানান্তরিত হচ্ছে- তার বাইরের এবং ভিতরের ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তবে তাঁর লেখাগুলিতে আফ্রিকার মানুষ ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-সমাজ জীবনের রীতিনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সেই ছবিও ফুটে ওঠে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আচেবে আফ্রিকীয় সমাজের পরাজয়ের ছবিটাই এঁকেছেন। সেই পরাজয় আসলে ঔপনিবেশিক দমনের কাছে এবং নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতার কাছে।