সঞ্জীব কুমার দুবে, পূর্ব মেদিনীপুর: বাড়ি নেই শুভেন্দুর। তারপরেও শিশির অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করলেন প্রশান্ত কিশোর। স্বাভাবিকভাবেই এই বৈঠক ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে বাংলার রাজনীতিতে। শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে এখন প্রবল গুঞ্জন এবং ফিসফিস। তৃণমূলে কি আদৌও থাকছেন শুভেন্দু! এই নিয়ে এখন জোর তরজা চলছে বাংলার রাজ্য রাজনীতিতে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ধোঁয়াশা।

গত কয়েক মাস ধরেই শুভেন্দু অধিকারী নাকি সেভাবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ছোঁয়া এড়িয়ে চলেছেন। রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী এবং তৃণমূল বিধায়ক সত্যিই সত্যিই কি বিজেপির দিকে পা বাড়িয়ে রয়েছেন? তা নিয়েও এখন চলছে লুডো খেলা। শোনা যাচ্ছে, কাঁথির অধিকারী বাড়ির মধ্যেও এই নিয়ে আলোড়ন পড়ে রয়েছে। তৃণমূলের বিশিষ্ট নেতা এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তৃণমূলকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা শিশির অধিকারী নাকি স্পষ্টতই শুভেন্দুকে নির্দেশ দিয়েছে, তৃণমূল না ছাড়ার জন্য। প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে  শিশির অধিকারীর এদিনের বৈঠক কতটা শুভেন্দুকে নিয়ে ছিল, তা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছেন না। তবে অধিকারী বাড়ির সামনে এদিন দুধসাদা গাড়ি থেকে প্রশান্ত কিশোর নেমে আসতেই রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়ে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে এই মুহুর্তে কাজ করছেন প্রশান্ত কিশোর। তার পিকে নামক যে টিম রয়েছে, তারা একদিকে যেমন তৃণমূলের উজ্জ্বল করছে, সেই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের বিক্ষুদ্ধ গোষ্টীকে মান ভাঙিয়ে দলের প্রতি অনুরক্ত করতে কাজ করে চলেছে। শিশির অধিকারীর সঙ্গে এদিন প্রশান্ত কিশোরের এই বৈঠক এমনই কোনও চেষ্টার কর্মসূচি কিনা, তা স্পষ্ট নয়।

স্থানীয় সূত্রে খবর, অধিকারী বাড়িতে এদিন প্রশান্ত কিশোর ঘণ্টা খানেক সময় কাটান। শিশির অধিকারীর সঙ্গেও তাঁর একান্ত আলাপচারিতা হয়েছে বলেও খবর। অসমর্থিত সূত্রে, অধিকারী বাড়ি থেকেই শুভেন্দু অধিকারীকে ফোন করেছিলেন প্রশান্ত কিশোর। এতে শুভেন্দু নাকি সাফ জানিয়ে দেন, তিনি এই মুহুর্তে জেলায় নেই। বাড়ি ফিরতে রাত হবে। শুভেন্দু অধিকারীর আর এক দিব্যেন্দু অধিকারী এদিন বাড়িতে ছিলেন না। শুভেন্দু এবং দিব্যেন্দু জেলার বাইরে কোথায় ছিলেন, সে নিয়ে জল্পনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। কারণ, শিশির অধিকারীর রাজনৈতিক নৈতৃত্বের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন বড়ছেলে শুভেন্দু। আর তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ভাই দিব্যেন্দুও।

শুভেন্দু গত কয়েক মাস ধরেই দলের বিশিষ্ট নেতাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলছেন। নন্দীগ্রাম দিবসেও শুভেন্দু তাঁর অনুগামীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে শুভেন্দুর অ-অনুরাগীদের দেখা কিন্তু পাওয়া যায়নি। গত কয়েক মাস ধরে শুধু পূর্ব মেদিনীপুরেও নয়, বিভিন্ন জেলাতেও একা একা কর্মসূচি পালন করেছেন শুভেন্দু। এমনকী, তাঁর সভায় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্য় কোনও নেতার ছবিও ব্য়ানারে স্থান পায়নি। এরমধ্যে মুর্শিদাবাদেও শুভেন্দু ঘনিষ্ট নেতাকে কোণঠাসা করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব। এমনকী, ফিরহাদের সঙ্গে নাম না করে বারবার বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন শুভেন্দু। ফিরহাদও প্রত্যুত্তর দিতে ছাড়ছেন না। সমস্যার সূত্রপাত, সম্প্রতি শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা-নেত্রীকে জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়নি। তৃণমূলের রাজপুত্রের সঙ্গে শুভেন্দুর যে তেমন বনিবনা হচ্ছে না, তা কানাঘুষোতে আগেই শোনা গিয়েছিল। 

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক অস্তিত্বকে যেভাবে সম্মান জানানো উচিত ছিল, তা তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব তা কার্য়কর করেনি। ২০১৪ সাল থেকেই তৃণমূলের অন্দর মহলে শুভেন্দুকে বারবার কোণঠাসা করার একটা প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই সমস্ত জল্পনা এবং কল্পনাকে ব্য়র্থ প্রমাণ করে তৃণমূলেপ সঙ্গেই নিজেকে প্রবল ভাবে জুড়ে রেখেছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে এই খবর রটেছিল যে, শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ রেখে চলেছে বিজেপি। আর এতে চাণক্য হিসেবে কাজ করছেন খোদ মুকুল রায়। যদিও শুভেন্দু এমন কোনও সম্ভাবনার কথা বারবার উড়িয়ে দিয়েছেন। এবার শুভেন্দু দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপর এতটাই ক্ষিপ্ত যে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে কপালে ভাঁজ পড়েছে। সম্প্রতি শুভেন্দু একটি সভা থেকে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বার্তাও দেন। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন, দম্ভ করলে তাঁর পতন অবশ্যম্ভাবী। রাজনৈতিক মহলের ধারনা, শুভেন্দুর এই বার্তা আসলে ছিল মমতার উদ্দেশ্যে পাঠানো এক আহ্বান। নেত্রী নিজেও যে শুভেন্দু ইস্যুতে শীর্ষ নেতৃত্বের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না, সেটা এদিন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। আর সেই কারণেই আপসের রফাসূত্র নিয়ে শিশির অধিকারীর কাছে পৌঁছন প্রশান্ত কিশোর। আপসের এই রফাসূত্র শুভেন্দুর রাজনৈতিক কেরিয়ারের পক্ষে কতটা সহায়ক এবং লাভজনক হবে, তা আর কয়েকদিন মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে এদিন শিশির অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেই বেরিয়ে যান প্রশান্ত কিশোর।