করোনার থাবায় ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর। তারমধ্যেই তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। নিউইয়র্কের গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১ মে তারিখের মধ্যে ২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বয়স এরকম অন্তত ১৫ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের দেহে একটি রহস্যজনক প্রদাহজনিত সিন্ড্রোম দেখা গিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ করোনাভাইরাস পজিটিভ হওয়ায় ডাক্তাররা সন্দেহ করছেন এই রোগের সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এখনও এই রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁরা পুরোপুরি অবগত নন।

নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এই শিশুদের দেহে যে সিন্ড্রোম দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গে ব্যাপক মিল রয়েছে 'কাওয়াসাকি রোগ'-এর। কাওয়াসাকি রোগ হল এমন এক দরণের অসুস্থতা যা সারা দেহে রক্তনালীতে প্রদাহ (ফোলাভাব এবং লালভাব) সৃষ্টি করে। এটি তিন ধাপে ঘটে এবং জ্বর সাধারণত এর প্রথম লক্ষণ। এই অবস্থাটি বেশিরভাগ ৫ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। নতুন ধরণের রোগটির ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলির অনেকগুলিই রয়েছে।

নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এই শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর, সারা গায়ে ফুসকুড়ি, পেটে ব্যথা, বমি-বমিভাব ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ ছিল। প্রত্যেককেই পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করতে হয়েছিল। তাদের কার্ডিয়াক অর্থাৎ হৃৎস্পন্দন চালু রাখতে ও শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম যন্ত্রের সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে। এখনও পর্যন্ত মাত্র ১৫ জনের ক্ষেত্রেই এই রোগ ধরা পড়লেও, ডাক্তারদের আশঙ্কা আরও অনেকেই সম্ভবত এই রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এই মুহুর্তে শুধুমাত্র গুরুতর আক্রান্তদেরই ধরা গিয়েছে, কারণ তাদের হাসপাতালের সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে।

এই ১৫ জন শিশুর মধ্যে চারজনের কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল ইতিবাচক  এসেছে। অর্ধেকেরও বেশি রোগীর রক্তচাপ বজায় রাখার জন্য যন্ত্রের সমর্থন লেগেছে। পাঁচজনের ক্ষেত্রে যন্ত্রের মাধ্যমে শ্বাসচলাচল চালু রাখতে হয়েছে। তবে কেউ এখনও মারা যায়নি বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। নিউইয়র্ক স্টেটের স্বাস্থ্য কমিশনার হাওয়ার্ড জুকার-এর নেতৃত্বে কর্মকর্তারা এই নতুন সিন্ড্রোমের তদন্ত করছেন।

এর আগে করোনাভাইরাসে মারাত্মক হানার মধ্যে ইউরোপিয় কয়েকটি দেশেও শিশুদের মধ্যে এই ধরণের সিন্ড্রোম দেখা যাচ্ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পায়ের পাতার রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেধে ফুলে যাচ্ছিল। সেইসঙ্গে প্রত্য়েক শিশুই কোভিড-১৯ আক্রান্ত ছিল। যা থেকে এর নাম দেওয়া হয়েছিল 'কোভিড টো' বা 'কোভিড পায়ের পাতা'। কিন্তু, এখন আমেরিকার পাশাপাশি ইউরোপেও সাম্প্রতিক সপ্তাহে দেখা যাচ্ছে এই ধরণের সিন্ড্রোম থাকা সব শিশু করোনা পজিটিভ নয়। তাতেই ক্রমে ধন্দ বাড়ছে বিজ্ঞানীদের।

নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য কমিশনার অক্সিরিস বারবোট বলেছেন, এই সিন্ড্রোমের সঙ্গে কোভিড-১৯'এর কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। সবার ডিএনএ টেস্ট বা সেরোলজি টেস্ট করা হয়েছে, কিন্তু সমস্ত ক্ষেত্রেই কোভিড-১৯ ইতিবাচক হয়নি। কিন্তু এই ভাইরাসের ক্লিনিকাল প্রকৃতি এমন, যে সমস্ত এলাকার ডাক্তারদের বলা হচ্ছে, এইরকম সিন্ড্রোমওয়ালা রোগীদের সন্ধান পেলে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। আর নাগরিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সন্তানদের জ্বর, ফুসকুড়ি, পেটে ব্যথা বা বমিভাবের মতো লক্ষণ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে কোনও ডাক্তার দেখাতে।

এই রোগের সঙ্গে করোনাভাইরাস-এর সম্পর্ক আছে কি নেই, নাকি এই নতুন সিন্ড্রোম কোনও নতুন ভাইরাস-এর কারসাজি, নাকি অন্য কোনও ভাইরাস-এর সঙ্গে করোনাভাইরাস মিলে মিশে এই খেল দেখাচ্ছে - এই প্রশ্নগুলোই এখন নতুন করে ভাবাচ্ছে মার্কিন বিজ্ঞানীদের।