চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভারতে আমন্ত্রণ করে এনে নাগরিক সংবর্ধনা দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। সেখানে ইউএস-ইন্ডিয়া 'ফ্রেন্ডশিপ, লং লিভ লং লিভ' বলে স্লোগান দেওয়া হলেও অনুষ্ঠানের নাম ছিল নমস্তে ট্রাম্প। আর সেটা ছিল একেবারেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মোদী প্রশাসনের সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়াস। কিন্তু, বর্তমানে আমেরিকায় এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যে ক্রমে চাপ বাড়ছে মোদী সরকারের উপরে।

২০১৪ সালে যখন প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী, সেই সময়ে মার্কিন মুলুকের প্রেসিডন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। সেই সময়ে একবারই মার্কিন সফর করেছিলেন মোদী। কিন্তু ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে বিশেষ। সখ্যতা গড়ে তুলততে পারেননি। কিন্তু, পরবর্তীকালে আমেরিকার তখতে ট্রাম্প আসতেই গত কয়েক বছরে কূটনৈতিক স্তরে দারুণ উন্নতি হয়েছে মার্কিন-ভারত সম্পর্কের।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন মোদী। আর তার ফলও পেয়েছেন হাতে-নাতে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলে ভারতকে সমর্থন করেছে আমেরিকা। এমনকী ভারতকে জি-৭ গোষ্ঠীর সদস্য করার জন্যও সুপারিশ করেছেন ট্রাম্প। সেইসঙ্গে চিন হোক কিংবা পাকিস্তান, প্রতিবেশিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে সবসময়ই মার্কিন সমর্থন পেয়েছে ভারত। ভারতে চিনা আগ্রাসনের জবাবে, ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে দক্ষিণ চিন সাগর ও দক্ষিণ এশিয়াতে মোতায়েন করেছে আমেরিকা।

কিন্তু, কোভিড মহামারি পরবর্তী সময়ে অবস্থাটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। মহামারির মোকাবিলার ব্যর্থতার ফলে ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমে কমছে। ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে মার্কিন ভোটারদের মাত্র ৪০ শতাংশ আস্থা রেখেছেন ট্রাম্পের উপর। আর ৫৫ শতাংশই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসাবে চাইছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী তথা ওবামা-র আমলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন-কে। যত দিন যাচ্ছে ততই বাইডেন-এর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। ট্রাম্প নিজেও পরাজয় দেখতে পাচ্ছেন, আর তাই এখন থেকেই ভোটে জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

আর এতেই চাপ বাড়ছে মোদী প্রশাসনের। ট্রাম্প পরাজিত হলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে গত কয়েক বছর ধরে গড়ে তোলা ভারত-মার্কিন সম্পর্কের রসায়নটাই ঘেঁটে যাবে শুধু নয়, অন্য সমস্য়াও তৈরি হতে পারে মোদী সরকারের জন্য।  এতদিন মার্কিন কংগ্রেসের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা সংক্রান্ত কমিটি বারবার নরেন্দ্র মোদীর শাসনকালে ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েছে বলে রিপোর্ট দিয়েছে। সিএএ-২০১৯ আইন লাগু হওয়ার পর এই আইনটিকে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করছে দাবি করে ভারতের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চাপানোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু এড়িয়েই গিয়েছিলেন ট্রাম্প।

জো বাইডেন যে ট্রাম্পের রাস্তায় হাঁটবেন না তার ইঙ্গিত কিন্তু ইতিমধ্যেই মিলেছে। ইতিমধ্যেই তিনি মোদী সরকারের ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। কাশ্মীরীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নয়াদিল্লির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯ এবং অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জীকরণের বিষয়ে জানিয়েছেন মোদী সরকারের এইসব সিদ্ধান্তে তিনি 'আশাহত'। বলেছেন, এইসব পদক্ষেপ ভারতের 'ধর্মনিরপেক্ষতার দীর্ঘকালের ঐতিহ্য এবং বহুজাতিক এবং বহুধর্মীয় গণতন্ত্র' বজায় রাখার ইতিহাসের সঙ্গে 'অসামঞ্জস্যপূর্ণ'।

কাজেই আমেরিকায় যতই কমছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা, ততই চাপ বাড়ছে মোদী প্রশাসনের। ট্রাম্প না ফিরলে 'ইন্ডিয়া-ইউএস ফ্রেন্ডশিপ' কিন্তু চলে যেতে পারে বিশ বাঁও জলে।