মিঠুন চক্রবর্তীর প্রথম পরিচয় অবশ্যই চলচ্চিত্র অভিনেতা। তবে অনেকেরই জানা নেই, একেবারে অল্প বয়স থেকেই রাজনীতির সঙ্গে তার সংশ্রব ছিল। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময়ই তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন নকশালপন্থীদের রাজনীতির সঙ্গে। রবি রঞ্জন নামে সেই সময়ের এক জনপ্রিয় নেতার সঙ্গে একেবারে গলায় গলায় বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। এসবই অবশ্য ফিল্ম জগতে আসার আগে।

এক সাক্ষাতকারে মিঠুন জানিয়েছিলেন, বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে তাঁর ভাই-এর মৃত্যু না হলে তিনি নকশালপন্থী রাজনীতিতেই থাকতেন, সিনেমায় নামার কথা ভাবতেনও না। ভাইয়ের মৃত্যুই তাঁকে পরিবারে ফিরিয়ে এনেছিল। তবে শোনা যায়, তারপরেও তাঁর প্রাণের ঝুঁকি ছিল। আর তা এড়াতেই মুম্বই পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।

তারপর, একের পর এক হিন্দি ছবিতে তাঁকে প্রতিবাদী যুবকের ভূমিকায় দেখা গেলেও রাজনীতির পথ আর মাড়াননি। এরপর, ফের তাঁর সঙ্গে রাজনীতির সংযোগ ঘটে ১৯৮৬ সালে। যুবভারতী স্টেডিয়ামে বলিউডি নায়ক-নায়িকা গায়ক-গায়িকাদের এনে 'হোপ ৮৬' অনুষ্ঠান করেছিলেন প্রয়াত সিপিএম নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী।

সেইসময় থেকেই সুভাষ চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রায় পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল মিঠুন চক্রবর্তীর। 'সুভাষদা' ডাকলে সবসময় মুম্বই থেকে কলকাতায় ছুটে এসেছেন মিঠুন। রাজ্যের যেখানে যেতে বলেছেন, গিয়েছেন। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুর সঙ্গেও শ্রদ্ধা-জড়িত সম্পর্ক ছিল। সুভাষ চক্রবর্তী তাঁকে বামেদের টিকিটে রাজ্যসভায় পাঠাতে চেয়েছিলেন বলেও শোনা যায়। সিপিএম-এর এক সূত্রের দাবি, মূলত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও আরও কয়েকজন নেতার বাধাতেই তা বাস্তব হয়নি।

 বামেদের সঙ্গে মিঠুনের এই ঘনিষ্ঠতা বজায় ছিল দীর্ঘদিন। সুভাষ চক্রবর্তীর প্রয়াণের পর স্মরণসভাতে তো তিনি ছিলেনই, এমনকী, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে রাজ্যজুড়ে বাম সরকার বেকায়দায় পড়ার পরও সঙ্গ ছাড়েননি তিনি। মৃণাল সেন-দের সঙ্গে রাজ্যে শিল্পায়নের দাবিতে হেঁটেছিলেন কলকাতার রাজপথে। তারপর ২০১১ সালে সুভাষ-জায়া রমলা চক্রবর্তীর হয়েও তাঁকে ভোট-প্রচার করতে দেখা গিয়েছিল। তবে ওই শেষ।

পরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল 'এমএলএ ফাটাকেষ্ট'র। শোনা যায় নেপথ্যে ছিল তৃণমূল বিধায়ক সুজিত বসুর হাত। একসময়ে সুভাষ চক্রবর্তীর একান্ত অনুগামী সুজিত বসুই একসময় প্রয়াত সুভাষের হয়ে মিঠুনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সেই যোগাযোগকে কাজে লাগিয়েই তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গে তিনি মিলিয়ে দিয়েছিলেন মিঠুনকে।

আর, এই ঘনিষ্ঠতা শুধু কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১৪ সালে মিঠুনকে বাংলা থেকে রাজ্যসভায় সাংসদ করে পাঠিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। এরপর এক সাক্ষাতকারে মিঠুন জানিয়েছিলেন, বাংলার উন্নয়নের জন্য তাঁকে যিনিই ডাকবেন, তিনি সাড়া দেবেন। মমতা তাঁকে বাংলা থেকে রাজ্যসভায় পাঠানোয়, বাংলার হয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন 'মহাগুরু'।

সেই স্বপ্ন অবশ্য ভঙ্গ হয়, বছর দুইয়ের মধ্যেই। ২০১৬ সালে সারদা চিট ফান্ড কাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। অভিমানে সপরিবারে চলে গিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে। তার আগে অবশ্য চ্যানেল ১০-এর থেকে বেতন হিসাবে নেওয়া সব অর্থ ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন।

তারপর দীর্ঘদিন তাঁকে রাজনীতির আঙিনায় দেখা যায়নি। অবস্থাটা পাল্টাতে শুরু করে, চলতি বছরের বসন্ত পঞ্চমীর দিন থেকে। ১৬ ফেব্রুয়ারি, মিঠুনের বাড়িতে গিয়েছিলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। তারপর থেকেই তাঁর বিজেপি-তে যোগদানের জল্পনা চলছিল। ব্রিগেডের সভায় উপস্থিত থাকা নিয়ে জল্পনা ছিল। সেই জল্পনাই আজ বাস্তব হল। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে মোদীর ব্রিগেডে উপস্থিত মিঠুন চক্রবর্তী। এবার মিঠুনের রাজনৈতিক কেরিয়ার কোনদিকে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে সকলের।