কথিত আছে এই মন্দিরের পুকুরে ডুব দিয়ে ডাকাতি শুরু করত ডাকাতরা। পাঁচশো বছর কেটে গেলেও সরানো হয়নি মন্দিরের ঘট। এখনও বসিরহাটের গোকনা কালী মন্দির সবার কাছেই আরাধনার  স্থান। কালীপুজো এগিয়ে আসতেই তাই মন্দির ঘিরে শুরু হয়েছে সাজ সাজ রব।  

বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া ব্লকের যদুরআঁটি দক্ষিণ গ্রাম পঞ্চায়েতেই পড়ে গোকনা গ্রাম। এই গ্রামেরই  বহু পুরোনো এবং জাগ্রত গোকনা কালী মন্দিরের মা ভবানী বহু জনের কাছেই বিশ্বাসের স্থল। অনেক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে এই কালী মন্দিরের সাথে। জমিদারী আমল থেকে চলে আসছে এই মা ভবানীর পুজো। বর্তমানে স্থানীয় গ্রামবাসীদের উদ্যোগেই কালী পুজোর দিন সাড়ম্বরে মা কালীর  আরাধনায় মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। কথিত আছে ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মা ভবানী কাছে প্রার্থনা করত দস্যুরা। ডাকাতি করতে দুর্গাপুজোর পর থেকেই শুরু হয়ে যেত এই মন্দিরে কালী পুজোর প্রস্তুতি । গ্রামবাসী ছন্দক বাইন মন্দির কমিটির সদস্য গৌতম হালদার বলেন, মন্দিরটি এতই পুরোনো যে এর সাথে জড়িত কিছু জনশ্রুতি রয়েছে। অনেকই সেই জনশ্রুতিতে বিশ্বাস করেন।

গ্রামবাসীরা জানান,টাকির জমিদারদের কাছ থেকে পত্তনী পেয়ে হালদাররা এখানে বসবাস শুরু করে । তারাই এখানে খড়ের গাদার তলার থানের আকারে ছোট কালী মাতার পুজো করতেন । পাথুরে কালীমূর্তি মা ভবানীর মন্দিরটা পাকাপাকি নির্মাণ হয় ১৩১৯ সালের ১৬ বৈশাখ । মন্দির সংস্কার হয় ১৩৮৮ সালে ।  এর অনেক বছর আগে খড়-গোলপাতার ছাউনির মন্দির ছিল। সেই সময় মাটির প্রতিমা হেমন্তের কার্তিকী অমাবস্যার রাতে পুজো হতো । কথিত আছে , ধান্যকুড়িয়ার জমিদার মহেন্দ্রনাথ গাইনের ছেলে মরণাপন্ন হলে স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি এই মন্দিরে আসেন । মায়ের আশীর্বাদে জমিদারের ছেলে পুনর্জীবন লাভ করে । এর ফলে জমিদার মহেন্দ্রনাথ গাইন পাকা গাঁথুনির মন্দির নির্মাণ করে দেন । তাঁর আগে থানটি ছিল প্রায় তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো । জমিদার মন্দির পাকা করার প্রস্তাব দিলে পুরোহিত কালীধন হালদারের জমি থেকে মাটি নিয়ে ইট পুড়িয়ে পুরোনো থানের পাশেই পাকা গাঁথুনির বড় মন্দির প্রতিষ্ঠা হয় । আগের ছোট প্রতিমাটি মন্দিরের পেছনের পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয় এবং কৃষ্ণনগর থেকে দেড়শো বছর আগে প্রতিমা নিয়ে আসেন জমিদার মহেন্দ্র গাইন চতুদোলায় চাঁপিয়ে । পুরানো প্রতিমা পুকুরে বিসর্জন দিলেও পুরোনো ঘটটি নতুন মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়। যার বয়স এখন প্রায় পাঁচশো বছরেরও বেশি ।

এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, এই মন্দিরে মা ভবানীর সঙ্গে পঞ্চানন শিব, নারায়ণ পুজিত হন । এক সময় ডাকাতরা এই মন্দিরের পেছনের পুকুরে ডুব দিয়ে মা ভবানীর পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে যেত বলে জনশ্রুতি আছে । মন্দিরে পুজিত তিনটি শিলাখণ্ড সম্পর্কে শোনা যায়, একদা জনৈক গ্রামবাসীর চাষ জমিতে লাঙ্গলের ফলায় মাটি খুঁড়ে যাওয়া তিনটি শিলাখণ্ড গড়িয়ে চলে আসে । আর একজন গ্রামবাসী তখন গাঁয়ের উড়নী শিলাখণ্ডগুলির ওপরে ফেলে ঢেকে দেয় । এখন ঐ শিলাখণ্ডগুলি মা ভবানীর সঙ্গে নিত্য পুজিত হয় । শিলাখণ্ডগুলি হল বৈদ্যনাথ, মানেশ্বর ও পঞ্চানন । বর্তমানে ঐ হালদার বংশেরই বংশধর অরুণ হালদার পুজো করে আসছেন চৌদ্দতম পুরুষ হিসেবে ।

এতিহ্যবাহী এই কালী মন্দির প্রতি কালী পুজোর রাতে সেজে ওঠে স্বমহিমায় । কালী পুজোর সপ্তাহে গ্রামবাসীরা মন্দির চাতালেই মেতে থাকেন । মন্দিরে পাঠাবলি, কুমড়ো বলির আয়োজন থাকে।  অনেকে বার্ষিক নিয়মে , তো কেউ কেউ মানসিক পুরোন করার জন্য পুজোয় মায়ের ভোগ চড়ান । কালী পুজোয় গ্রামবাসীদের জন্য মন্দিরেই ভোজনের আয়োজন থাকে । আশপাশের প্রচুর লোক সমবেত হয় এই মন্দিরে পুজোর সময় ।