সব্যসাচী দত্তের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব আরও প্রকট হয়ে গেল। বিধাননগর  পুরসভায় পুরবোর্ডের বৈঠকেই এ দিন এলেন না মেয়র সব্যসাচী দত্ত। গরহাজির আরও মোট তেইশজন কাউন্সিলর। তার পরেই সব্যসাচীর বিরুদ্ধে মুখ খুলে বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন ডেপুটি মেয়র তাপস চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, বিধাননগর পুরনিগমে অন্যান্য কাউন্সিলরদের কোনও কাজ করতে দিচ্ছেন না মেয়র সব্যসাচী দত্ত। 

বিধাননগর পুরসভায় মোট ৪১ জন কাউন্সিলর রয়েছেন। তার মধ্যে  এ দিনের বৈঠকে মাত্র আঠারোজন হাজির হন। ফলে ভেস্তে যায় বৈঠক। লোকসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই দলের বিরুদ্ধেই সরাসরি তোপ দেগেছেন বিধাননগরের মেয়র এবং বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত। তাঁর বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা এবং বিধাননগরের বিধায়ক সুজিত বসুর বিধানসভা এবং ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়ার পরেও কেন মন্ত্রিসভায় তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল তা নিয়েও কটাক্ষ করেন সব্যসাচী। বিধাননগরের মেয়র অবশ্য নিজের ওয়ার্ডেও পিছিয়ে পড়েছেন। তাঁর বিধানসভা এলাকা রাজারহাট- নিউ টাউনে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও বিধাননগর পুর নিগম এলাকা ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩১টিতেই পিছিয়ে পড়েছে শাসক দল। 

এ সবকিছু এ দিন পাল্টা সব্যসাচীর বিরুদ্ধে তোপ দাগেন বিধাননগর পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান তাপস চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, "পুরসভার কোনও কাজ করতে দিচ্ছেন না মেয়র সব্যসাচী দত্ত। অনেকদিন ধরেই আমরা ওনার কার্যকলাপে বিরক্ত। তৃণমূলে উনি আছেন না নেই, সেটাই স্পষ্ট নয়। ওনার রাজনৈতিক পরিচয় কি, সেটা আগে উনি দলের সামনে পরিষ্কার করুন।" একদা রাজারহাটের সিপিএমের দাপুটে নেতা তাপস চট্টোপাধ্যায় তৃণমূলে যোগদানের পরে বিধাননগর পুরসভার ডেপুটি মেয়র হন। তৃণমূলে তিনিও সব্যসাচীর বিরুদ্ধে গোষ্ঠীর বলেই পরিচিত। তাপসবাবুর আরও অভিযোগ, রাজারহাটে বাড়ির প্ল্যান পাশ, ট্রেড লাইসেন্স পাশ করার মতো কোনও কাজই করতে দিচ্ছেন না মেয়র সব্যসাচী দত্ত। 

এ দিনের বৈঠক তাপসবাবু নিজেও গরহাজির ছিলেন। কেন তিনি এবং অন্যান্য বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর বৈঠকে যাননি, তা দলকে তাঁরা জানাবেন বলেও দাবি করেছেন তাপস চট্টোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, তাঁরা তৃণমূলেই থাকবেন। যদিও মেয়রের বিরুদ্ধে তাঁরা অনাস্থা আনবেন কি না, তাও স্পষ্ট করেননি তাপসবাবু। গত চার বছরে সব্যসাচীর সম্পর্কে দলকেও তিনি অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেছেন তাপস চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রশ্ন, "সব্যসাচী দত্ত একটানা দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন। অনুপম হাজরা দল বিরোধী একটা পোস্ট করেছিল বলে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। দলের কাছে আমরা জানতে চাইব, সব্যসাচীবাবু কি দলের ঊর্ধ্বে?"  তাপসবাবুর দাবি, রাজারহাট- নিউটাউন বিধানসভা কেন্দ্রে দলের এগিয়ে থাকার পিছনেও সব্যসাচীর কোনও অবদান নেই। 

একই সঙ্গে তাপসবাবু দাবি করেছেন, সব্যসাচীবাবুর দাবি মতো যদি সুজিত বসুকে পদত্যাগ করতে হয়, তাহলে বিধাননগর পুরনিগম এলাকায় ৩১টি ওয়ার্ডে পিছিয় পড়ার জন্য সব্যসাচীবাবুকেও পদত্যাগ করা উচিত। তবে বিজেপি সুবিধা পায়, এমন কিছু তাঁরা করবেন না বলেও দাবি করেছেন তাপসবাবু। 

এ দিনের ঘটনার পরে স্বভাবতই বিধাননগর পুরসভার ভবিষ্যত নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হল। একবছর বাদেই এই পুরনিগমেও নির্বাচন। তার আগেই বিধাননগর পুরসভায় বড়সড় কোনও বদল হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। ইতিমধ্যেই রাজ্যের পাঁচ পুরসভা দখল করেছে বিজেপি। বিধাননগরের ছবিটাও আগামী কয়েকদিনেই পরিষ্কার হতে পারে। সব্যসাচী দত্তের গতিবিধির উপরে অনেক দিন ধরেই নজর রাখছে শাসক দল। একদিকে মুকুল রায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, অন্যদিকে প্রকাশ্যেই দল বিরোধী মন্তব্য, নিজের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় রেখেছন সব্যসাচীবাবু। এ দিনের বৈঠকে গরহাজিরা নিয়ে অবশ্য তাঁর দাবি, শরীর খারাপ থাকার কারণেই তিনি আসতে পারেননি।