আন্দোলনের জোর বোঝাতে গিয়ে কি অহেতুক সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করছেন জুনিয়র চিকিৎসকরা? নাকি যুক্তিযুক্ত দাবি নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনের পক্ষে যে জনসমর্থন তাঁরা পেয়েছিলেন, তারই অপব্যবহার করছেন তাঁরা? রবিবারও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক নিয়ে যেভাবে নতুন কিছু শর্ত চাপিয়েছেন আন্দোলনকারীরা, তার পরে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। 

শনিবার মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি রাজভবনে গিয়েও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে তৈরি। কিন্তু সেই প্রস্তাব এ দিন খারিজ করে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের এখন দাবি, জনসমক্ষে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে মুখ্যমন্ত্রীকে। যেখানে রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যায় জুনিয়র চিকিৎসকদের রাখতে হবে। 

আন্দোলনকারীদের এতদিনের দাবি মেনে মুখ্যমন্ত্রী এনআরএসে আসেননি, এটা যেমন ঠিক, তেমনই শনিবার যে তিনি নিজের কড়া অবস্থান থেকে সরে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সন্ধির বার্তা দিয়েছেন, তাও অস্বীকার করা যায় না। 
 এই অবস্থায় জুনিয়র চিকিৎসকরা নতুন করে শর্ত চাপিয়ে সমাধান সূত্র বেরনোর সম্ভাবনাকে আরও বিলনম্বিত করে দিলেন বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী এসে খোলা জায়গায় আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে দর কষাকষি করতে রাজি হবেন, সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবচিত, সে প্রশ্ন থাকছেই। 

গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে সরকারি হাসপাতাল অকথ্য হয়রানির মুখে পড়েছেন বহু রোগী। বিনা চিকিৎসায় শিশুদের মৃত্যুর অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। তার পরেও চিকিৎসকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছেন সমাজের বড় অংশের মানুষ। এমন কী, বিশিষ্টজনেরাও তাঁদের সমর্থনে মিছিলে পা মিলিয়েছেন। এসএসকেএম হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তাও সমর্থন করেননি সমাজের বহু মানুষ। জনমত বুঝেই হয়তো মুখ্যমন্ত্রী নিজে বলেছেন, সব দাবি মেনে নিতে সরকার তৈরি। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ সরকার নেবে না।  তাহলে এর পরে কোথায় বৈঠক হবে তা নিয়ে এতটা অনড় থেকে কি প্রমাণ করতে চাইছেন আন্দোলনকারীরা? যে জনসমর্থনের ভিত্তিতে তাঁরা এতদিন আন্দোলন করছিলেন, নিজেদের একগুঁয়েমির জন্যই তা এবার জনরোষে বদলে যাবে না তো?

ছ' দিনের আন্দোলন হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে জুনিয়র চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয়তা কতটা, তা সরকার, রোগী সবাই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। দেশজুড়ে সমর্থন পেয়েছেন এ রাজ্যে জুনিয়র চিকিৎসকরা। কিন্তু শুধু মুখে 'কাজে যোগ দিতে চাই' বলে অবস্থানে অনড় থেকে গেলাম, তাতে কি কাজে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রমাণিত হয়? ধরা যাক, এবার সরকার বলল তাঁরা বৈঠক নিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবে রাজি নয়। তখন কি হবে, আরও সাতদিন ধরে তাঁরা একইভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন?


গোটা আন্দোলন পর্বে চিকিৎসকরা একজোট হয়েছিলেন। এখনও তাঁদের একতায় চিড় ধরেনি। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরিণতি যাই হোক না কেন, তার দায় হয় তো নিতে চাইছেন না আন্দোলনের মাথারা। সেই কারণেই হয়তো জনসমক্ষে বৈঠকের দাবি। যাতে, চোখের সবাই দেখতে পারেন, বৈঠকে কী হয়েছে। কিন্তু এত বড় সমস্যার সমাধান এ ভাবে কি প্রকাশ্যে সম্ভব? মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছেন, এসএসকেএমে বিক্ষোভকারীরা তাঁকে ধাক্কা মেরেছে, আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রকাশ্য বৈঠকে যদি এরকম কিছু পুনরাবৃত্তি হয়, তার দায় কি নিতে পারবেন জুনিয়ের চিকিৎসকরা। তার থেকে রাজ্যপালের মতো তৃতীয় কোনও পক্ষের উপস্থিতিতে এই বৈঠক হতেই পারত। তার পরেও যদি, সরকার দাবি পূরণ না করে, তাহলে তো ফের আন্দোলনে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই পথে হাঁটলেন না আন্দোলনকারীরা। ফলে, সরকার যেমন কড়া অবস্থান থেকে সরে এসেছে, তেমনই আন্দোলনকারীদেরও জেদ ছেড়ে এবার ইতিবাচক পদক্ষেপ করুন। তা না হলে বোধহয় সত্যিই অনেক দেরি হয়ে যাবে।