মুর্শিদাবাদে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাজনীতি নাকি পারিবারিক বিবাদ? গত কয়েকদিন ধরে রীতিমতো তোলপাড় চলেছে রাজ্যে।  এমনকী একটা সময় দাবি করা হচ্ছিল যে আরএসএস করার জন্যই জিয়াগঞ্জের শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল এবং তাঁর অন্তসত্ত্বা স্ত্রী বিউটি ও শিশুপুত্রকে খুন হতে হয়েছে। এই নিয়ে রাজনীতির ময়দানেও জল ঘোলা হয়েছে। অনেক বিদ্বজনেরাও এই খুন নিয়ে মুখ খুলেছেন, কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। এই নৃশংস হত্যায় পুলিশি তদন্তের হাত থেকে রেহাই পায়নি পরকিয়া প্রেমের তত্ত্বও। এর জন্য নিহত শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল-এর বন্ধু সৌভিককেও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু, মঙ্গলবার সব হিসেবটাই উল্টে দিয়েছে পুলিশ। কারণ, জিয়াগঞ্জ হত্যার পিছনে চিটফান্ডকাণ্ড-ই দায়ী বলে দাবি করেছে পুলিশ। সেইসঙ্গে এই খুনে জড়িত থাকার অভিযোগে উৎপল বেহারা নামে এক রাজমিস্ত্রী-কে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার শ্রী মুকেশ জানিয়েছেন, অর্থলগ্নি সংস্থার লগ্নি করা নিয়ে বিবাদের কারণে পরিকল্পনামাফিক শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল, তাঁর স্ত্রী বিউটি ও ছেলেকে খুন করেছে উৎপল। জেরায় অপরাধ স্বীকারও করেছে সে। নিহত শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল-এর বাড়ি মুর্শিদাবাদেরই সাগরদিঘির সাহাপুরে। তা সত্ত্বেও জিয়াগঞ্জে আলাদা বাড়ি করেছিলেন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল। স্ত্রী বিউটি ও সন্তানকে নিয়ে সেই বাড়িতেই থাকতেন তিনি।  বিউটি আবার সন্তানসম্ভবা ছিলেন। দশমীর দিনে নিজের বাড়িতে সপরিবারে নৃশংসভাবে খুন হয়ে যান প্রাথমিক স্কুলের ওই শিক্ষক।

পুলিশি তদন্তে জানা যায়, বিভিন্ন অর্থলগ্নি সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন  বন্ধুপ্রকাশ পাল। সৌভিক বনিক নামে মৃতের নাম বন্ধুর নামও উঠে আসে।  তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সৌভিককে নিয়মিত টাকা ধার দিতেন বন্ধুপ্রকাশ। বিষয়টি আবার একেবারেই পছন্দ ছিল না ওই শিক্ষকের স্ত্রী বিউটির। সেক্ষেত্রে  এই খুনের নেপথ্যে পারিবারিক বিবাদ কিংবা বিবাহ-বর্হিভূত সম্পর্ক দিকটিও খতিয়ে দেখছিল পুলিশ। বীরভূমের সিউড়ি থেকে সৌভক আটকও করা হয়। জিয়াগঞ্জে এনে তাঁকে দফায় দফায় জেরাও করেন তদন্তকারী অফিসাররা।  জেরা করা নিহত শিক্ষকের বাবা, এক বন্ধ, এমনকী বাড়ির দুধ বিক্রেতাকেও। কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হয়নি। বরং নিত্য নতুন তথ্যে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছিল।

সোমবার রাতে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির যে গ্রামে শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল-এর পৈতৃক বাড়ি, সেই সাহাপুর থেকে উৎপল বেহরা নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সে পেশার রাজমিস্ত্রি। তদন্তকারীদের দাবি, অর্থলগ্নি সংস্থায় ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করা নিয়ে বন্ধুপ্রকাশ পালের সঙ্গে উৎপল বেহরার বিবাদ চলছিল। জেরায় ওই রাজমিস্ত্রি জানিয়েছে, টাকা নিয়ে তাকে বেশ কয়েকবার অপমানও করেছিলেন বন্ধুপ্রকাশ। পুলিশের দাবি, আক্রোশেই সপরিবারে বন্ধুপ্রকাশ ও তাঁর পরিবারকে খুন করে উৎপল। পুজোর সময়ে জিয়াগঞ্জে দিদির বাড়িতে বসেই খুনের পরিকল্পনা করেছিল উৎপল। দোকান থেকে একটি হাঁসুয়াও কিনে আনে। সেই হাঁসুয়া দিয়েই খুন করে বন্ধুপ্রকাশ পাল, তাঁর স্ত্রী বিউটি ও বছর ছয়েকের ছেলেকে।  এদিকে মুর্শিদাবাদ হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত উৎপল বেহার নিয়ে যখন লালবাগ মহকুমা আদালতে পৌঁছয় পুলিশ, তখন আদালত চত্বরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তের পক্ষে সওয়াল করতে রাজি হননি আইনজীবীরা। উৎপলকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।