Asianet News BanglaAsianet News Bangla

রাত ১২টায় থানায় ঢুকিয়ে মাফিয়াদের জমি দিয়ে দিতে চাপ আইসি-র, প্রকাশ্য রাস্তায় গলায় ফাঁস প্রৌঢ়র

  • ল্যান্ড মাফিয়াদের দৌরাত্মে তিতিবিরক্ত মানুষ
  • সাধারণ জনমানসকে নিরাপত্তা না দেওয়ার অভিযোগ
  • কাঠগড়ায় হরিশ্চন্দ্রপুর থানার ভাবমূর্তি 
  • দিনের পর দিন অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে এলাকা
The alleged involvement of Police with land Mafia in Harishchandrapur creates chaos in Maldah
Author
Kolkata, First Published Oct 17, 2020, 7:03 PM IST
  • Facebook
  • Twitter
  • Whatsapp

রাতের আঁধারে বসত-ভিটে-র উপর হামলা ল্যান্ড মাফিয়াদের। তা প্রতিহত করতে গিয়ে বাঁশের বাড়ি জুটল বাড়ির লোকেদের। এমনকী মাফিয়াদের বাঁশের বাড়ি থেকে রেহাই পায়নি এক নাবালকও। তাঁকে বাঁশ দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। বাঁশের আঘাতে শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে সেই নাবালকের। এমনকী, শরীরের বিভিন্নস্থানে রক্ত বের হতে থাকে। গোটা ঘটনায় ৫০ হাত দূরে থাকা থানায় সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন পরিবারের কর্তা। বিনিময়ে থানার আইসি এবং আরও কিছু অফিসারের ঘেরাটোপে শুনতে হল মাফিয়াদের জমি দিয়ে দেওয়ার শাসানি। থানার আইসি থেকে থেকে বেশ কয়েক জন অফিসার প্রত্যেকে সাফ জানায় হয় জমি দিন না হলে অবিলম্বে জমি বাবদ অর্থ বের করুন। পুলিশের কাছে মাঝরাতে এমন কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই থ'হয়ে যান পরিবারের কর্তা। গুরুতর এই অভিযোগ মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর থানার বিরুদ্ধে। আর এই অভিযোগের এক্কেবারের কেন্দ্রে রয়েছেন থানার আইসি সঞ্জয় কুমার দাস। 

ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। হরিশ্চন্দ্রপুর থানার লাগোয়া রায় পরিবারের বসত ভিটে। হরিশ্চন্দ্রপুরে কয়েক পুরুষের বাস। সমভ্রান্ত এবং বনেদী পরিবার বলে একাকালের বর্ধিষ্ণু হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামের তাদের খ্যাতি আজও চলে আসছে। এখন প্রকৃত বসতভিটে-র মধ্যে বাস রয়েছে কয়েক শরিকের। এরমধ্যে এক শরিক পারিজাত রায়। তাঁর বোন ভারতী খান আচমকাই স্থানীয় এক ল্যান্ড মাফিয়াকে এই বসত ভিটের কিছু অংশ বিক্রি করে দেন। পারিজাত রায়-এর অভিযোগ, পারিবারিক সম্পত্তি এবং বসতভিটে-তে বোনের অংশীদারিত্ব কোনও দিনই অস্বীকার করেননি।  পারিবারিক সম্পত্তিতে বোনের অংশীদারিত্ব তাঁর নামে করে দেওয়ারও নাকি কথা হয়েছিল। যেহেতু, পারিজাত রায়ের স্বর্গীয় পিতা সম্পত্তির কোনও বন্টননামা করে যাননি ফলে, বসতভিটের কোন অংশে কার অধিকার রয়েছে সেটা নিশ্চিত নয়। পারিজাত রায় এশিয়ানেট নিউজ বাংলা-কে জানিয়েছেন, বসতভিটের কোন অংশ কার নামে হবে সে মিমাংসা হওয়ার আগে এবং স্ব-স্ব নামে পরচা বের হওয়ার আগেই তাঁর বোন ভারতী খান স্থানীয় এক যুবক বাবলু কর্মকারকে সম্পত্তির বেশকিছুটা অংশ একটি ভুল পরচার মাধ্যমে কয়েক লক্ষ টাকায় বিক্রি করেন। এরপর থেকেই পারিজাত রায়ের বসত ভিটেতে পাওয়া জমি-র দখল নিতে উঠে-পরে লাগে বাবলু। যদিও, একটি বেআইনি পরচা ছাড়া বাবলু-র কাছে জমির উপরে মালিকানার স্বস্ত্ব প্রয়োগ করার মতো কোনও নথি ছিল না বলে অভিযোগ। এরপর আদালত থেকে বসত ভিটের সম্পত্তি বিক্রির উপরে স্থগিতাদেশ নেন পারিজাত রায়। এরপরও বাবলু হরিশ্চন্দ্রপুর থানার সঙ্গে যোগসাজোশে পারিজাত রায়ের বসত ভিটে দখল করার জন্য হুমকি-শাসানি এবং মারধরের মতো বিষয়কে হাতিয়ার করেছে বলেও অভিযোগ।  

"

এশিয়ানেট নিউজ বাংলার সূত্রে খবর, বাবলু কর্মকার একজন স্থানীয় দুষ্কৃতী হিসাবে পরিচিত। বেশকিছু অপরাধমূলক কাজেও তার একাধিকবার নাম জড়িয়েছে। একটা সময় মেলায় ছোটখাটো হকারির কাজ করত বাবুল। সম্প্রতি স্থানীয় এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার ডানহাত হয়ে ওঠে। আর এরপর থেকেই অর্থবলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে বাবলু। পঞ্চায়েতের কনট্রাক্টারির কাজ করলেও বাবলু নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে এখনও জড়িত বলে অভিযোগ। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি-রও অভিযোগ সামনে এসেছে। সম্প্রতি হরিশ্চন্দ্রপুরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ল্যান্ড মাফিয়াদের দল। বিশেষ করে হরিশ্চন্দ্রপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত রাস্তার দুধারে থাকা বাড়ি এবং খোলা জমির উপরে নজর পড়েছে এই ল্যান্ড মাফিয়াদের। যে কোনও অজুহাতে এই ল্যান্ড মাফিয়াদের দলের লোকেরা পারিবারিক বিবাদে কোনও একটা পক্ষের কাছের মানুষ হয়ে উঠছে। আর সেই সুযোগে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি। পারিজাত রায়ের পরিবারিক বিবাদে এভাবেই ঢুকে পড়ে বাবলু কর্মকার এবং তার সঙ্গীরা। এই ঘটনায় কার্তিক ভট্টাচার্য নামে এক দালাল-এর নামও জড়িয়েছে। 

আরও পড়ুন- রণক্ষেত্র হরিশ্চন্দ্রপুরের চণ্ডীপুর, মন্দিরে ভাঙচুর, রাজ্যপালের টুইটে চড়ল উত্তেজনার পারদ

অভিযোগ, গত কয়েক মাসে একাধিকবার থানায় পারিজাত রায়-কে ডেকে পাঠান আইসি সঞ্জয়কুমার দাস। সেখানে বাবলু কর্মকার, আফজল-সহ কয়েক জনের সামনে বসিয়ে জমির মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার জন্য পারিজাত রায়কে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এমনকী, হরিশ্চন্দ্রপুর থানার এই আইসি-র বিরুদ্ধে অতি সক্রিয়তারও অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তিনি সারাক্ষণ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের ঘনিষ্ট দুষ্কৃতীদের প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। যার বড় উদাহরণ এই বাবলু কর্মকার। অভিযোগ, পারিজাত রায় তাঁর বসতভিটের চারপাশে বেড়া দিতে গেলে আইসি সঞ্জয়কুমার দাস থানায় ডেকে তাঁকে শাসান। এমনকী, পারিজাত রায়কে ফোন ধরিয়ে দিয়ে বলেন বাবলু কর্মকারের সঙ্গে কথা বলতে। এখানেই শেষ নয়, পারিজাত রায় এই ঘটনার প্রতিবাদ করলে, আইসি সঞ্জয়কুমার দাস ইমেলে পারিজাত রায়ে বোনের অভিযোগ নামা নিয়ে আসেন বলেও অভিযোগ। অথচ, পারিজাত রায় দিনের পর দিন এই বেআইনি বিক্রি নিয়ে থানায় যেসব অভিযোগ জমা করতে যান, আইসি সঞ্জয়কুমার দাস তা গ্রহণ-ই করতে চাননি বলে অভিযোগ। এমনকী, শুক্রবার সকালে যখন দুষ্কৃতী বাবলু কর্মকার তার দলবল নিয়ে হামলা করে সে সময়ও থানায় অভিযোগনামার সঙ্গে আদালতের স্থগিতাদেশের প্রতিলিপি জুড়ে দিয়েছিলেন। পরে, আইসি সঞ্জয়কুমার দাস তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সেই স্থগিতাদেশ প্রাপ্তির কথা চেপে যান। এমনকী, জানিয়ে দেন তিনি এমন কোনও স্থগিতাদেশের প্রতিলিপি পাননি। পারিজাত রায়ের আরও অভিযোগ, যখনই আদালতের স্থগিতাদেশনামা নিয়ে আইসি সঞ্জয়কুমার দাস-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছেন, তখনই তিনি বলেছেন, এমন একাধিক স্থগিতাদেশ নাকি তাঁর টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। একজন, আইনরক্ষের আদালতের স্থগিতাদেশনামা নিয়ে এমন তাচ্ছিল্য আদালত অবমাননারই সামিল বলে মন্তব্য করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতি।  

আরও পড়ুন- দিল্লি থেকে অটো-ওলা-উবার করে হরিশ্চন্দ্রপুরে পরিযায়ী শ্রমিকরা, আতঙ্কে তটস্থ মানুষ

শুক্রবার সকালে হরিশ্চন্দ্রপুরে আসেন পারিজাত রায়ের বোন ভারতী খান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছেলে এবং তাঁর হবু জামাই ও হবু জামাই-এর এক তুতো দিদি-সহ আরও কয়েক জন। অভিযোগ, বাবলু কর্মকারকে সঙ্গে করে পারিবারিক সম্পত্তি-র মধ্যে থাকা মেন রাস্তা লাগায়ো একটি ফাঁকা জমি দখলের চেষ্টা করেন ভারতী। এই নিয়ে পারিজাত রায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা আপত্তি জানালে তিনি থানায় চলে যান। ইতিমধ্যেই বাবলু কর্মকারের নেতৃত্বে এক বিশাল দুষ্কৃতীদল সেখানে জমায়েত করে বলে অভিযোগ। বিষয়টি থানায় জানানো হলেও কোনও সাহায্য মেলেনি বলে অভিযোগ। এই সময়েই পুলিশি নিস্ক্রিয়তা এবং মাফিয়ারাজের তাণ্ডব দেখে হরিশ্চন্দ্রপুর থানার সামনেই গলায় ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করেন পারিজাত রায়-এর এক তুতো ভাই। তিনিও ওই বসত ভিটে এলাকায় সপরিবারে বাস করেন। তড়িঘড়ি তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ অনুভব করলে ছেড়ে দেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন- লকডাউনে খাদ্য বলতে কচুপাতা সেদ্ধ, অন্নের হাহাকারের কান্নায় ১০০টি প্রান্তিক পরিবারের

এরপর রাতে ফের উত্তপ্ত হয় পরিস্থিতি। বাবলু কর্মকার তাঁর দুষ্কৃতীদের নিয়ে ফের জমি দখলের চেষ্টা করে। এবার পারিজাত রায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাধা দিতে গেলে সশস্ত্র বাবলু এবং তাঁর দলবল মারমুখী হয়ে ওঠে। এই হামলার আগে বাবলুরা রাস্তার সমস্ত আলো ভেঙে দিয়েছিল বলেও অভিযোগ। অন্ধকারের মধ্যে নিরস্ত্র পারিজাত রায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বেধড়ক মারধর করা হয়। পরিবারের এক নাবালক সদস্যকেও বাঁশ দিয়ে পেটায় বাবলু ও তার দল। অভিযোগ, ৫০ হাত দূরে থানার মেন গেট। অথচ পারিজাত রায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে কোনও পুলিশকর্মী ঘটনাস্থলে প্রথমে আসেনি বলে অভিযোগ। প্রায় ৩০ মিনিট পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশের সামনে শাসানি দিতে দিতে বাবলু এবং তার দুষ্কৃতী দল পালিয়ে যায়। পরে, এই নিয়ে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে রাত ১২.৩০টা পর্যন্ত পারিজাত রায় এবং তাঁর ভাইকে থানায় বসিয়ে রাখেন আইসি সঞ্জয়কুমার দাস। কিছুক্ষণে আগে হয়ে যাওয়া হামলা নিয়ে কোনও কথা বলা তো দূরস্ত, অভিযোগ সঞ্জয়কুমার দাস এবং তাঁর সঙ্গী কয়েকজন অফিসার সমানে দুষ্কৃতীদলের হয়েও সওয়াল করতে থাকেন পারিজাত রায়কে। হয় জমি ছাড়ুন, না হলে জমি বাবদ অর্থ দিয়ে দিন- এমন গোছরের কথাও আইসি-র কাছ থেকে শুনতে হয় পারিজাত রায়কে। শেষমেশ সকালের গণ্ডগোলের প্রেক্ষিতে একটি এফআইআর থানায় জোর করে জমা করেন পারিজাত রায়। অভিযোগ, সেই এফআইআর কপির সঙ্গে আদালতের স্থগিতাদেশ ফের একবার জমা করানো হলেও আইসি নাকি বলেন, এই সব কাগজের কোনও মূল্য নেই। নতুন করে শনিবার দুপুরে আরও একটি এফআইআর জমা করানো হয় পারিজাত রায়ের পরিবারের পক্ষ থেকে। সেই এফআইআর-এর সঙ্গে রাতের হামলায় আহত পরিবারের সদস্যদের মেডিক্যাল রিপোর্টও জমা করানো হয়। অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত পুলিশ অভিযুক্ত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আইসি-র ভাবমূর্তি নিয়ে জেলা পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের কাছেও নালিশ জানানো হয়েছে। 

Follow Us:
Download App:
  • android
  • ios