আগের সপ্তাহের রবিবার অধিকাংশ মানুষের জীবন জেরবার হয়েছিল আমফান নিয়ে। কারণ আমফানের ঝড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ও জলসঙ্কটে পড়ে মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকী, জায়গায় জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। সপ্তাহ ঘুরতেই আমফানের জেরে তৈরি সঙ্কট কিছুটা মোচন হতেই এবার উত্তাপ ছড়াল তৃণমূল কংগ্রেসের গোষ্ঠী কোন্দল নিয়ে। আর দিনটা সেই রবিবার। তাও আবার রবিবাসরীয় সন্ধ্যা। যাকে বলে, নিশ্চিন্ত এক ছুটির দিনে ভায়োলেন্সের উসকানি। যেন হিন্দি ছবির চিত্রনাট্য। যার মুখ্য চরিত্রে মলয় মুখোপাধ্যায় বনাম সঞ্জিত কুমার চট্টোপাধ্যায়। 

মলয় মুখোপাধ্যায় রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের সভাপতি। আর সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায় ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলে দেওয়া বার্তা অনুযায়ী আপাতত পুরভোট পর্যন্ত ওয়ার্ডের পুর-কার্য পরিচালনার কোঅর্ডিনেটর। সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই ঘটনায় মিটিং-এ যোগ দিতে আসা রাজু নামে এক তৃণমূলকর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। রাজুর চোখে ভালোরকম আঘাত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন সঞ্জিত। 

রবিবার সন্ধ্যায় ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের পুর-কাজকর্ম পরিচালনা নিয়ে দলের কর্মী-সমর্থক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে মিটিং করছিলেন সঞ্জিত। পুর-পরিষেবা কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। কারণ, রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার মেয়াদ ২০ তারিখ শেষ হতেই কিছুটা জটিলতা তৈরি হয় প্রশাসক বসানো নিয়ে। নগরোন্নয়ন দফতর থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে চলা রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার প্রশাসক এবং তার কাউন্সিলের নাম নির্বাচিত করে চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার একটা মহলের অভিযোগ ছিল ২৭ তারিখ পেরিয়ে গেলেও সেই প্রশাসক নিয়োগের কাজ সম্পন্ন করেননি পুরসভার এক্সিকিউটিভ অফিসার। যার জেরে পুরসভার চেয়ারম্যানে প্রাক্তন হয়ে যাওয়া পল্লব দাস রেগেমেগে বাড়িও চলে যান। যদিও, এক্সিকিউটিভ অফিসারের দাবি ছিল, তিনি যথাসময়ে চিঠি পল্লব দাসের হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে প্রশাসক হিসাবে নিযুক্তকরণের বিষয়টি নাকি জানিয়ে দিয়েছিলেন। প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে এই জটিলতার মাঝে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পুর পরিষেবা নিয়ে কিছু অচলাবলস্থা তৈরি হয়। কারণ রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার কাউন্সিলাররা প্রাক্তন হয়ে যাওয়ায় বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে তাঁরা কাজ চালিয়ে যাবেন। এই নিয়ে কোনও লিখিত ও সুনির্দিষ্ট কাজের নির্দেশিকা ছিল না। 

এমতাবস্থায়, ঘূর্ণিঝড় আমফান আছড়ে পড়ে এবং কাউন্সিলাররা সেভাবে সক্রিয় না থাকায় বহু ওয়ার্ডেই মানুষ সমস্যায় পড়েন বলে অভিযোগ। এমনকী, পুরসভা থেকে বহু ওয়ার্ডেই পাণীয় জল পৌঁছয়নি। ২৯ তারিখের পর থেকে ফের কাউন্সিলাররা সক্রিয় হতে শুরু করেন। প্রাক্তন বনে যাওয়া এই কাউন্সিলাররা আপাতত ওয়ার্ডে পুর পরিষেবার কো-অর্ডিনেটর হিসাবে কাজ করে যাওয়ার একটা স্পষ্ট ধারনা পেয়ে যান। সেই মোতাবেক রবিবার সন্ধ্যায় অর্থাৎ ৩১ মে সন্ধ্যায় ওয়ার্ডে মিটিং করতে শুরু করেছিলেন ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়। 

একটি ভিডিও-তে দেখা গিয়েছে, মিটিং চলাকালীন আচমকাই সেখানে একদল তরুণ এসে ভিড় জমাতে শুরু করে। এমনকী, এদের মধ্যে একজন সঞ্জিত-এর সামনে গিয়ে হাত নেড়ে তাঁর বক্তৃতা থামিয়ে দেয়। এরপরই সেখানে হইহট্টগোল শুরু হয়ে যায়। সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মিটিং-এ আসা মানুষদের সঙ্গে গণ্ডগোল পাকানো তরুণদের বচসা বেঁধে যায়। সেখান থেকে হাতাহাতিতে গড়ায় বিষয়টি। মিটিং-এ ঢুকে আচমকাই গণ্ডগোল বাধানো তরুণরা ওয়ার্ডে তৃণমূল সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায়ের নামে ধ্বনি দিতে শুরু করে। এতে পাল্টা সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নামে ধ্বনি দিতে থাকে তাঁর অনুগামীরা। পরিস্থিতি চরম বিশৃঙ্খলার আকার নেয়। 

সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই পুরো হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন মলয় মুখোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে এই হামলা হয় বলে সরাসরি অভিযোগ করেন তিনি। মলয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীরা সকলেই মদ্যপ অবস্থায় ছিল বলেও সঞ্জিতের অভিযোগ। এমনকী এরা লাঠি-সোটা থেকে শুরু করে ধারাল অস্ত্র ও সাইকেল চেন হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে মিটিং-এ ঢুকে পড়েছিল বলেও সঞ্জিতের অভিযোগ। মলয় মুখোপাধ্যায়ের এই গ্যাং-এর ধারাল অস্ত্র এবং চেনের আঘাতেই রাজু নামে এক তৃণমূল কর্মী গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ। গণ্ডগোলের খবর পেয়ে নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। 

অভিযুক্ত মলয় মুখোপাধ্যায় পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে, তাঁর অনুগামীরা মিটিং গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে বড় কোনও ধরনের ঘটনা ঘটার আগেই অনুগামীদের সরিয়ে আনেন। তাঁর আরও অভিযোগ, সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের অসংখ্য অভিযোগ। দলীয় নেতৃত্বকে জানিয়েও কোনও সুরহা হয়নি। তাই এবার আস্তে আস্তে এই সব ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এদিন ছিল তার বহিঃপ্রকাশ। এছাড়াও সঞ্জিতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ এনেছেন তিনি। 

কোনও অভিযোগ অবশ্য মানেননি সঞ্জিত। তিনি জানিয়েছেন নরেন্দ্রপুর থানায় মলয় মুখোপাধ্যায়-সহ গদাই ওরফে অমিত দে, সোনা ওরফে সুমিত রায়, সুব্রত দে এবং আরও কিছু মানুষের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্রপুর থানার ওসি সুখময় চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু লাগাতার মোবাইল ফোন বেজে গেলেও তিনি তা তোলেননি। অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার তৃণমূল সভাপতি শুভাশিস চক্রবর্তী-র ফোন বেজে গেলেও তিনি কোনও সাড়া দেননি। তবে, এই ঘটনায় জড়িত দোষীদের অবিলম্বে শাস্তি দাবি করেছেন সঞ্জিত।