
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীরা অষ্টম পে কমিশনের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন। বর্তমানে এই কমিশনের কাজ জোরকদমে চলছে। বেতন বৃদ্ধি, নতুন পে স্কেল, মহার্ঘ ভাতা (DA), বাড়ি ভাড়া ভাতা (HRA) এবং পেনশন নিয়ে তারা বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে। ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর অষ্টম পে কমিশন গঠন করা হয়। গঠনের দিন থেকে ১৮ মাসের মধ্যে তাদের রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
অষ্টম পে কমিশনের মূল লক্ষ্য হলো কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বর্তমান বেতন কাঠামো খতিয়ে দেখা। বিশেষ করে বেসিক পে, পে ম্যাট্রিক্স, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিষয়ে তারা সুপারিশ করবে।
বর্তমানে সপ্তম পে কমিশনের পে ম্যাট্রিক্স অনুযায়ী বেতন দেওয়া হয়। নতুন পে কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হলে, বর্তমান বেসিক পে নতুন পে ম্যাট্রিক্স অনুযায়ী বদলে যাবে।
তবে কর্মীদের বেতন ঠিক কতটা বাড়বে, তা নিয়ে এখনও কোনও সরকারি ঘোষণা হয়নি। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বেতনের তালিকাগুলোকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
অষ্টম পে কমিশন নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের কথা। বর্তমান বেসিক পে-কে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে গুণ করে নতুন বেসিক পে ঠিক করার পদ্ধতিই হলো ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর।
উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান বেসিক পে যদি ৪৪,৯০০ টাকা হয় এবং ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.১ ধরা হয়, তবে হিসেবটা দাঁড়াবে:
৪৪,৯০০ × ২.১ = ৯৪,২৯০ টাকা।
অর্থাৎ নতুন বেসিক পে এই অঙ্কে পৌঁছতে পারে। তবে ২.১ সংখ্যাটি এখনও সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি, এটি নিছকই একটি অনুমান। অষ্টম পে কমিশন আসল ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর সুপারিশ করবে এবং তারপর কেন্দ্র সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
একজন সরকারি কর্মীর মাসিক বেতন মানে শুধু বেসিক পে নয়। বেসিক পে-র ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন ভাতা হিসেব করা হয়। তাই বেসিক পে বাড়লে তার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ভাতাতেও পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক।
বিশেষ করে ডিএ (DA), এইচআরএ (HRA) এবং ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্সের মতো বিষয়গুলো কর্মীদের টেক-হোম স্যালারিতে বড় ভূমিকা রাখে।
এর ফলে নতুন পে ম্যাট্রিক্স এবং ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর চূড়ান্ত হলে, কর্মীদের মোট মাসিক আয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আসবে।
মহার্ঘ ভাতা বা ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স (DA) হলো কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বেতনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামলাতে দেওয়া হয়।
নতুন পে কমিশন কার্যকর হলে বর্তমান ডিএ কীভাবে হিসেব করা হবে এবং তা নতুন বেসিক পে-র সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, সেটা এখন একটা বড় প্রশ্ন।
নতুন পে কমিশন চালু হলে ডিএ হিসেব করার পদ্ধতিতে বদল আসতে পারে। তবে এর চূড়ান্ত নিয়মকানুন এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
কর্মীদের বেতনে হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স (HRA) এবং ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্স (TPTA)-ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কর্মী কোন শহরের ক্যাটাগরিতে কাজ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এইচআরএ বদলায়। নতুন বেসিক পে বাড়লে এইচআরএ-র হিসেবেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে নতুন বেতন কাঠামোর ভিত্তিতে ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্সও নতুন করে খতিয়ে দেখা হতে পারে।
বর্তমান সপ্তম পে কমিশনে লেভেল-৭ কর্মীর শুরুর বেসিক পে হলো ৪৪,৯০০ টাকা। ২.১ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ধরলে, নতুন বেসিক পে হতে পারে প্রায় ৯৪,২৯০ টাকা। অর্থাৎ শুধু বেসিক পে ধরলে প্রায় ৪৯,৩৯০ টাকা বৃদ্ধির হিসেব পাওয়া যাচ্ছে। তবে এর মানে এই নয় যে, প্রতি মাসে হাতে পাওয়া বেতন ঠিক ৪৯,৩৯০ টাকাই বাড়বে। কারণ নতুন ডিএ, এইচআরএ, ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্স, এনপিএস (NPS) কাটা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত টেক-হোম স্যালারি আলাদা হবে।
আশা করা হচ্ছে, অষ্টম পে কমিশনের সুপারিশ ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের টার্মস অফ রেফারেন্সেও সাধারণ ১০ বছরের পে কমিশন চক্র অনুযায়ী ০১.০১.২০২৬ থেকে এর প্রভাব পড়ার কথা বলা হয়েছে। তবে রিপোর্ট জমা পড়া, সরকারের পর্যালোচনা, অনুমোদন এবং চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর হওয়ার তারিখ নিশ্চিত করা যায় না। যদি এটি পরে কার্যকর হয়, তবে মাঝের সময়ের জন্য এরিয়ার্স বা বকেয়া টাকা কীভাবে দেওয়া হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে কেন্দ্র সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
পে কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে বেতন বেড়ে যাবে, এমনটা বলা যায় না। প্রথমে কেন্দ্র সরকার সেই সুপারিশগুলো খতিয়ে দেখবে। এরপর যেগুলো গ্রহণ করা হবে, সেই অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। তাই রিপোর্ট জমার তারিখ, অনুমোদনের তারিখ এবং কার্যকর হওয়ার তারিখ—এই তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা ধাপ। কত টাকা এরিয়ার্স মিলবে, তা নির্ভর করে কোন তারিখ থেকে নতুন বেতন হিসেব করা হচ্ছে, কোন কোন ভাতার ওপর এরিয়ার্স দেওয়া হচ্ছে এবং ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কত ঠিক করা হচ্ছে, তার ওপর।
অষ্টম পে কমিশন সারা দেশ জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী, পেনশনভোগী, ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে মতামত নিচ্ছে। সরকারি সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৭ ও ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ২২ ও ২৩ অক্টোবর মুম্বইয়ে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু বেতন নয়, ভাতা, পেনশন এবং কাজের পরিবেশের মতো বিভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অষ্টম পে কমিশনকে ১৮ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে তারা রিপোর্ট জমা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এরপর কেন্দ্র সরকার সেই সুপারিশগুলো খতিয়ে দেখে গ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। তাই বর্তমানে ৯৪,২৯০ টাকা বেসিক পে, ২.১ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর, নির্দিষ্ট বেতন বৃদ্ধি বা এরিয়ার্সের খবরগুলোকে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। এগুলো সবই নিছকই প্রত্যাশা বা হিসেবের উদাহরণ মাত্র।
সব মিলিয়ে অষ্টম পে কমিশনে বেসিক স্যালারি বৃদ্ধি, নতুন পে ম্যাট্রিক্স, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর, ডিএ, এইচআরএ, ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্স, পেনশন এবং এরিয়ার্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং কেন্দ্র সরকারের অনুমোদনের পরেই প্রতিটি পে লেভেলের জন্য নতুন বেসিক পে এবং মোট বেতন ঠিক কত হবে, তা স্পষ্টভাবে জানা যাবে। ততদিন পর্যন্ত সামনে আসা বেতনের হিসেবগুলোকে শুধুমাত্র অনুমান হিসেবেই দেখা উচিত।