
বন্ধ্যাত্ব সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানতে পারলেন তাঁর শরীরে জরায়ু রয়েছে। আর তারপরেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে দিল্লির ২৪ বছরের এক যুবকের। খবর অনুযায়ী, সন্তান না হওয়ার কারণে ওই যুবক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছিলেন। পরীক্ষা করে দেখা যায় তিনি অ্যাজোস্পার্মিয়া (Azoospermia - বীর্যে শুক্রাণু না থাকা)-য় ভুগছেন। পাশাপাশি চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেন যে তাঁর দুটি শুক্রাশয় বা অণ্ডকোষ পেটের ভেতরেই রয়ে গেছে, নীচে নেমে আসেনি (Undescended testes)। আরও বিশদ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর শরীরে জরায়ু-সহ বিভিন্ন মুল্যারিয়ান স্ট্রাকচার (Müllerian structures)-এর উপস্থিতি ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা এটিকে পারসিস্টেন্ট মুল্যারিয়ান ডাক্ট সিন্ড্রোম (Persistent Müllerian Duct Syndrome বা PMDS) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি একটি বিরল জন্মগত সমস্যা, যেখানে একজন পুরুষের স্বাভাবিক বাহ্যিক শারীরিক গঠন থাকা সত্ত্বেও শরীরের ভেতরে মুল্যারিয়ান স্ট্রাকচার রয়ে যায়।
এই ঘটনাটি এটিই তুলে ধরে যে প্রজনন বা শারীরিক গঠনের কিছু জটিল সমস্যা বছরের পর বছর গোপন থাকতে পারে এবং বন্ধ্যাত্বের মতো চিকিৎসার পরীক্ষা না করা পর্যন্ত তা ধরা নাও পড়তে পারে।
PMDS হল যৌন বিকাশজনিত এক বিরল ব্যাধি, যা জিনেটিক্যালি পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ভ্রূণ অবস্থায় সাধারণ পুরুষদেহে অণ্ডকোষ থেকে তৈরি হওয়া অ্যান্টি-মুল্যারিয়ান হরমোন (AMH)-এর প্রভাবে মুল্যারিয়ান ডাক্টগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু যদি এই হরমোন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি না হয় বা শরীর এতে সাড়া না দেয়, তবে এই অঙ্গগুলো রয়ে যায়। MDS-এ আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির বাইরে থেকে পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষের মতো সাধারণ পুরুষের অঙ্গ থাকলেও, শরীরের ভেতরে জরায়ু অবস্থান করতে পারে।
এই ধরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হল প্রজনন ক্ষমতা। স্বাভাবিক অণ্ডকোষে সুস্থ শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের ভেতরের তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। অণ্ডকোষ যদি থলিতে (Scrotum) না নেমে পেটের ভেতর বা অন্য কোথাও থেকে যায়, তবে শুক্রাণু তৈরিতে সমস্যা তৈরি হয়। তবে PMDS হলেই যে কেউ বাবা হতে পারবেন না, তা নয়। প্রজনন ক্ষমতা নির্ভর করে অণ্ডকোষের কার্যকারিতা, শুক্রাণু তৈরি হওয়া এবং অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা সম্ভব কি না তার ওপর। যদি পুরুষটির অণ্ডকোষের আকার স্বাভাবিক থাকে এবং বীর্যে শুক্রাণু উপস্থিত থাকে, তবে তিনি স্বাভাবিকভাবেই সন্তান জন্মদানে সক্ষম হতে পারেন।
যাদের বীর্যে শুক্রাণু পাওয়া যায় না, তাঁদের অণ্ডকোষ থেকে সরাসরি শুক্রাণু সংগ্রহ করা যায় কি না চিকিৎসকরা তা খতিয়ে দেখেন। পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে IVF বা ICSI-এর মতো সহায়ক প্রজনন পদ্ধতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদি অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে থাকে এবং তা সঠিকভাবে কাজ না করে, বা কোনও সুস্থ শুক্রাণু না পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ডোনার (Donor) শুক্রাণু ব্যবহারের বিকল্পও বিবেচনা করা যেতে পারে। পুরুষ বন্ধ্যাত্ব কেবল স্পার্ম কাউন্ট (Sperm Count) দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়; প্রজনন অঙ্গের গঠন, হরমোন, জিনেটিক্স বা বিকাশের সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে PMDS-এর মাত্র কয়েকশো কেস নথিভুক্ত রয়েছে, যার কারণে এটি অত্যন্ত বিরল। একজন পুরুষ হিসেবে বেড়ে ওঠা ব্যক্তির শরীরে জরায়ু পাওয়ার বিষয়টি চমকপ্রদ হলেও, এটি তাঁর লিঙ্গ পরিচয় (Gender Identity) নির্ধারণ করে না বা প্রজনন সম্ভাবনাকেও সরাসরি বাতিল করে দেয় না। চিকিৎসকদের মতে, বাহ্যিক রূপ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অ্যান্ডোলজি, রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রিনোলজি এবং প্রয়োজনে জিনেটিক্স বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে তবেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।