
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) পুনরুদ্ধারের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠছে। এবার সেই দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের নোয়াখালি, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দরকেও জুড়ে দিলেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। তাঁর দাবি, দেশভাগের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জোর করে এই অঞ্চলগুলি পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাই এবার সেই অঞ্চলগুলিও পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে। সংবাদ সংস্থা ANI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে বলেন, পাকিস্তানের কাছ থেকে শুধু পাক অধিকৃত কাশ্মীর ফিরিয়ে আনলেই হবে না। নেহরুর আমলে যে অঞ্চলগুলি হস্তান্তর করা হয়েছিল, সেগুলিও ফিরিয়ে আনার দাবি তোলা প্রয়োজন। সেই তালিকায় নোয়াখালি, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
বিজেপি সাংসদের দাবি, নোয়াখালি, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দর একসময় তৎকালীন তিপ্রা রাজ্যের অংশ ছিল। বর্তমানে যে অঞ্চল ত্রিপুরা নামে পরিচিত, সেটিই আগে তিপ্রা রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল বলে দাবি তাঁর। নিশিকান্তের বক্তব্য, তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য দেশভাগের সময় নেহরুর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ত্রিপুরার রাজা প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁর রাজ্যের ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেহরুকে কে দিয়েছে? এমনকী, নোয়াখালি পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া এবং সিলেট ও চট্টগ্রামে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন মহারাজা, দাবি বিজেপি সাংসদের। নিশিকান্তের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন রাজা চেয়েছিলেন, তাঁর রাজ্য ভারতের অংশ হবে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হবে, নাকি স্বাধীন থাকবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁরই থাকা উচিত।
১৯৪৬ সালের নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক হিংসার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নিশিকান্ত দুবে। তাঁর অভিযোগ, সেই সময় কংগ্রেস নেতৃত্বের অগ্রাধিকার ছিল অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লিগকে অন্তর্ভুক্ত করা। অন্যদিকে নোয়াখালিতে হিন্দুদের উপর হিংসার ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। নিশিকান্তের অভিযোগ, ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর নেহরু মুসলিম লিগকে সরকারে শামিল করার বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অথচ ওই বছরের অক্টোবর মাসে নোয়াখালিতে ভয়াবহ হিংসার ঘটনা ঘটে। এই প্রসঙ্গে নোয়াখালিতে একদিনে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন বিজেপি সাংসদ। তবে এই সংখ্যাটি তাঁর করা দাবি, স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে নয়।
নিশিকান্ত দুবের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। তাঁর দাবি, দেশভাগের সময় চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের হাতছাড়া হওয়ার ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিজেপি সাংসদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের খনিজ সম্পদ, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর যুক্তি, চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের হাতে থাকলে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি অনেক বেশি সম্ভব হত। সেই কারণেই চট্টগ্রাম বন্দর, নোয়াখালি ও সিলেট পুনরুদ্ধারের দাবি তুলেছেন তিনি।
সিলেটের গণভোট এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নিশিকান্ত। তিনি বাহারুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, গণভোট এবং দেশভাগের সময়কার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ব্যক্তির ভূমিকা ছিল, যাঁদের সঙ্গে মুসলিম লিগের যোগসূত্র ছিল। বাহারুল ইসলামের পরবর্তী রাজনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় জীবন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ নিশিকান্ত দুবের বক্তব্য, সেগুলিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ত্রিপুরার ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নিশিকান্ত দুবে। তাঁর দাবি, সর্দার বল্লভভাই পটেলের উদ্যোগে সেনা পাঠানোর পর ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ত্রিপুরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাঁর বক্তব্য, মহারানি কাঞ্চনপ্রভা দেবী সংযুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু দেশভাগের সময় ত্রিপুরা রাজপরিবারের আপত্তি এবং দাবিগুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বিজেপি সাংসদের। সব মিলিয়ে, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের পাশাপাশি বাংলাদেশের নোয়াখালি, সিলেট ও চট্টগ্রাম বন্দর পুনরুদ্ধারের দাবি তুলে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উস্কে দিলেন নিশিকান্ত দুবে। তাঁর এই মন্তব্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে