
সিজেপি (CJP) কর্মী অভিজিৎ দিপকে রাজধানী দিল্লির যে বাড়িতে থাকছিলেন, সেখানে আচমকাই হাজির হয় দিল্লি পুলিশের একটি দল। এক পুলিশ কর্তার উপস্থিতিতে ওই সিজেপি কর্মীকে একটি নোটিশ ধরানো হয়। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, কনট প্লেস এলাকায় বিএনএস (BNS)-এর ১৬৩ ধারা জারি রয়েছে। নোটিশে আরও সতর্ক করা হয় যে, শনিবারের প্রস্তাবিত 'তেরঙ্গা যাত্রা'-র জন্য এনডিএমসি (NDMC) কোনও অনুমতি দেয়নি। এরপরও যদি সিজেপি কনট প্লেসে এই কর্মসূচি করে, তবে তা বিএনএস-এর ১৬৩ ধারার লঙ্ঘন বলে ধরা হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিপকে-কে পুলিশ এও জানিয়েছে যে, তেরঙ্গা ওড়ানো বেআইনি নয়। কিন্তু অনুমতি ছাড়া মিছিল করা বা ভিড় জমানো বিধিনিষেধের পরিপন্থী। এমনটা করলে পুলিশ আইনি পথে হাঁটবে। পাশাপাশি, ফ্ল্যাগ কোড বা জাতীয় পতাকা বিধি মেনে পতাকাকে যথাযথ সম্মান জানানোর বিষয়টিও তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগে, বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে এবং রাজধানীতে প্রশাসনের কড়াকড়ির সমালোচনা করে দিপকে কড়া প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ক্ষমতায় থাকা মানুষদের কাছে জবাবদিহি চাওয়াটা কোনওভাবেই "নৈরাজ্য নয়", বরং এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অধিকার।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (X)-এ একটি পোস্টে দিপকে দাবি করেন, সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের জেরে অর্থনীতি ধাক্কা খায় না। তিনি লেখেন, "শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য ব্যবসা মার খায় না। ব্যবসা তখন মার খায়, যখন সরকার গোটা শহর বন্ধ করে দেয়, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখে, নাগরিকদের চলাফেরায় রাশ টানে আর শহরটাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে। ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party) তৈরির সময় থেকেই আমরা বলে আসছি, আমরা সবসময় গান্ধীর দেখানো শান্তি ও অহিংসার পথেই চলব। আর সেই কথা আমরা রেখেছি। মুম্বই, পুনে, জয়পুর, লখনউ, বেঙ্গালুরু এবং নাগপুরে আমরা প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছি, আর তার প্রতিটিই ছিল শান্তিপূর্ণ। জয়পুরে আমার ওপর হামলা হয়েছিল, তবুও আমি পাল্টা মারমুখী হইনি। কারণ, হিংসার বদলে হিংসা আমাদের আদর্শের বিরোধী। গায়ের জোর দেখানোর চেয়ে ড. বি আর আম্বেদকরের নেতৃত্বে তৈরি সংবিধান আমাদের যে অধিকার দিয়েছে, আমরা সেটাই প্রয়োগ করতে চাই।"
শাসকদলকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা বলেন, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা নিয়ে রাজনীতিকদের দ্বিচারিতা রয়েছে।
দিপকে বলেন, "আমরা চুপ থাকতে রাজি নই বলেই আমাদের বারবার নৈরাজ্যবাদী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের কাছে উত্তর চাওয়াটা নৈরাজ্য নয়, রাস্তায় নেমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটা নৈরাজ্য নয়, আর যারা সরকারি পদে বসে আছেন তাঁদের প্রশ্ন করাটাও নিশ্চিতভাবে কোনও নৈরাজ্য নয়।"
অভিজিৎ আরও বলেন, "আজ যে দল ক্ষমতায় রয়েছে, তারা যখন বিরোধী আসনে ছিল, তখন দশকের পর দশক ধরে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছে, তৎকালীন সরকারকে প্রশ্ন করেছে। আজ যে বিধিনিষেধ, ভয় দেখানো বা পুলিশের দমনপীড়ন চলছে, সেটা যদি তখন তাদের ওপর হতো, তবে আজ যারা ক্ষমতায় বসে আছেন, তাঁরা হয়তো এই জায়গায় পৌঁছতেই পারতেন না। বিরোধী দলে থাকলে প্রতিবাদকে গণতান্ত্রিক অধিকার বলে উদযাপন করা, আর ক্ষমতায় এলে সেই একই কাজকে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের তকমা দেওয়াটা চরম দ্বিচারিতা।"
নাগরিকরা শুধু তাঁদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারটুকু প্রয়োগ করতে চাইছেন বলে দাবি করেন দিপকে। তিনি বলেন, "আমরা কোনও বাড়তি সুবিধা বা বিশেষ খাতির চাইছি না। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, এই প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি নাগরিকের যে অধিকার রয়েছে, আমরা শুধু সেটাই প্রয়োগ করতে চাইছি। মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার মানুষের কথা শুনতে বাধ্য, তাদের মুখ বন্ধ করতে পারে না। ভোট গোনা শেষ হয়ে গেলেই গণতন্ত্র শেষ হয়ে যায় না।"
শুক্রবার সেন্ট্রাল পার্কে সিজেপি কর্মী অভিজিৎ দিপকের ডাকা 'লহরা দো তেরঙ্গা' (Lehra Do Tiranga) কর্মসূচির আগে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কনট প্লেস ও তার আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আর ঠিক সেই আবহেই দিপকের এই মন্তব্য সামনে এল। দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেল ৩টে থেকে কনট প্লেস এবং সংলগ্ন বেশ কিছু রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হতে পারে। নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল (NDMC) ঘোষণা করেছে যে, "প্রশাসনিক কারণে" ১৬ ও ১৭ অক্টোবর কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ থাকবে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, কনট প্লেস এবং তার আশেপাশের এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১৬৩ ধারায় ইতিমধ্যেই নিষেধাজ্ঞামূলক নির্দেশিকা জারি রয়েছে। সিজেপি-র প্রস্তাবিত এই প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে আইন অনুযায়ী সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দিল্লি হাইকোর্টকেও আশ্বস্ত করেছে পুলিশ।