
আজকাল বাকস্বাধীনতার অধিকার বা ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের কারণে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবি করতে পারেন। আর ঠিক এই কারণেই আসল বা স্বীকৃত সাংবাদিকদের আলাদা করে চিনে তাঁদের সুরক্ষা দেওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার দিল্লির বিক্ষোভে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হেনস্থার মামলার শুনানিতে এমনই মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট।
গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালীন মহিলা সাংবাদিকদের ওপর পুলিশি হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। প্রধান বিচারপতি (সিজেআই) সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এই মামলাটি শুনছিলেন। আদালত জানিয়েছে, এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, "সমস্যাটা হলো, বাকস্বাধীনতার অধিকারের দোহাই দিয়ে এখন সবাই নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবি করেন।" ডিজিটাল দুনিয়ায় কারা আসল সাংবাদিক আর কারা নন, সেই সীমারেখা টানা যে কতটা কঠিন, সেটাও আদালত উল্লেখ করেছে। আদালত জানিয়েছে, স্বীকৃত সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ইনফ্লুয়েন্সার বা অন্যদের থেকে তাঁদের আলাদা করা প্রয়োজন।
শুনানি চলাকালীন প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং আদালতকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানান। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১০-১১ অক্টোবর দিল্লির বিক্ষোভের সময় এক মহিলা সাংবাদিককে এক পুরুষ পুলিশ অফিসার বেধড়ক মারধর করেছেন। ওই সাংবাদিকের হয়েই লড়ছেন জয়সিং। পাশাপাশি, হেনস্থার শিকার হওয়া অন্যান্য মহিলা সাংবাদিকদের নামের একটি তালিকা মুখবন্ধ খামে আদালতে জমা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, এগুলো খুবই গুরুতর বিষয় এবং খতিয়ে দেখা দরকার। কীভাবে এই মামলাগুলোর তদন্ত হবে, সেটাও আদালত বিবেচনা করবে। কেন্দ্র ও দিল্লি পুলিশের আইনজীবী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে আদালত কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেছে, "ওই মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো কড়া পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।"
ইন্দিরা জয়সিং এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার জন্য প্রাক্তন মহিলা বিচারক এবং প্রাক্তন আইপিএস অফিসারদের নিয়ে একটি কমিটি গড়ার প্রস্তাব দেন। তবে আদালত জানিয়েছে, আপাতত জয়সিংয়ের আবেদনে যে নির্দিষ্ট নির্যাতিতার কথা বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়া শুধু তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আদালত আরও জানায়, "আমরা এই মামলাটি শুধু আপনার আবেদনে উল্লেখিত নির্দিষ্ট নির্যাতিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।" আদালত জানিয়েছে, নির্যাতিতাদের অধিকার এবং সাংবাদিকদের নিয়ে ওঠা উদ্বেগের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
আদালত বলে, "কিছু পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে এর তদন্ত করানো দরকার কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।"
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন, আজকাল "হাতে একটা ফোন থাকলেই" যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, যাঁরা নিজেদের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক বলেন, তাঁদের অনেকেই আসলে "রিল মেকার" বা ভিডিও বানান। কে আসল সাংবাদিক, তা বোঝা কর্তৃপক্ষের জন্য সত্যিই কঠিন। তবে তিনি এও মেনে নেন যে, কোনো মহিলাকেই হেনস্থা করা উচিত নয়, এমনকি মহিলা পুলিশকর্মীদেরও নয়। এর পাল্টা জবাবে ইন্দিরা জয়সিং বলেন, স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার অধিকার সবার রয়েছে। আদালত জানিয়েছে, আইনজীবীদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে আরও চারটি মামলা তাদের কাছে এসেছে।
আদালত বলে, "আইনজীবীদের ওপর হামলার চারটি আবেদন আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা বিষয়টি জানি এবং এই চারটে আবেদনের বিষয়েও কর্তৃপক্ষের জবাব চেয়ে নোটিশ পাঠাচ্ছি।" শুনানিতে এও জানানো হয় যে, বিক্ষোভের জেরে হকার এবং ট্যাক্সি চালকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রবীণ আইনজীবী এন. হরিহরণ এক বিক্ষোভকারীর হয়ে জানান, তাঁর মক্কেলকে থানায় ফেলে মারা হয়েছে এবং তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন। এই মারধরের প্রমাণ হিসেবে একটি পেনড্রাইভও রয়েছে বলে তিনি জানান। এর প্রেক্ষিতে আদালত বলে, "আমাদের দরজা সবার জন্য খোলা।"
বিক্ষোভকারী, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রের জবাব তলব করেছে আদালত। পাশাপাশি, পুলিশের বাজেয়াপ্ত করা ক্যামেরার সরঞ্জাম ফেরত চেয়ে প্রবীণ আইনজীবী সি.ইউ. সিংয়ের আবেদনটিও আদালত আমলে নিয়েছে।
গত ১০-১১ অক্টোবর দিল্লিতে হওয়া বিক্ষোভ নিয়ে একাধিক মামলার শুনানি চলছে। এর আগে আদালত এই মামলাগুলোকে চারটি মূল ভাগে ভাগ করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে— শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক করা, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং বিক্ষোভের সময় জারি করা বিধিনিষেধ না মানার অভিযোগ।