
জাপানের এক প্রাক্তন মন্ত্রী মুম্বাই-আমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পে কথিত বিলম্বের জন্য ভারতের একজন মন্ত্রী ও কর্তাদের দায়ী করেছেন। জাপানের প্রাক্তন বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা ১৫ জুলাই তাঁদের বিরুদ্ধে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন যে, শিনকানসেন প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সময় কর্তারা বারবার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন এবং স্বার্থপরতা দেখিয়েছেন। জাপানের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মতামত-ধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে প্রকল্পটি তার মূল শিনকানসেন মডেল থেকে সরে এসেছে—ঠিক তার পরেই মাকিহারার এই মন্তব্য সামনে এল।
মাকিহারা 'এক্স' (X)-এ এক পোস্টে দাবি করেন যে, ভারতের এই প্রধান উচ্চ-গতির রেল করিডোরটির কাজে ধীরগতির জন্য সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় পক্ষই দায়ী। ভারতের প্রথম উচ্চ-গতির রেল করিডোর—মুম্বাই-আমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল (MAHSR)-এর প্রথম অংশের কাজ শেষে ২০২৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ধাপে ধাপে যাত্রী পরিষেবা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মুম্বাই-আমেদাবাদ করিডোরে জাপানি শিনকানসেন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এতে জাপানি সরকারের সংস্থা 'জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি' (JICA) আংশিক ফান্ডিং করছে।
টোকিও-ভিত্তিক একটি ব্যবসায়িক সংবাদ পোর্টালে প্রকাশিত ইসাও সুজিমুরার একটি প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে মাকিহারা ১৫ জুলাই 'এক্স'-এ এই মন্তব্য করেন। সুজিমুরা একজন প্রবীণ জাপানি রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি মূল জাপানি শিনকানসেন মডেল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে সরে এসেছে। সুজিমুরা অভিযোগ করেন যে, ২০২৩ সালে পরিষেবা শুরুর লক্ষ্যমাত্রাটি যে অবাস্তব, তা ভারতীয় কর্তারা ব্যক্তিগতভাবে জানতেন।
মাকিহারার এই অভিযোগের মধ্যেই সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI) ভারতীয় সরকারি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চ-গতির ট্রেন প্রকল্প নিয়ে ভারত ও জাপানের মধ্যে আলোচনা ভালোভাবে এগিয়ে চলেছে। বস্তুত, ভারতের বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি সম্প্রতি নির্মাণকাজের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
ভারতীয় কর্তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন না—মন্তব্য জাপানের প্রাক্তন মন্ত্রীর
টোকিও-ভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রকাশনা 'তোয়োকেইজাই অনলাইন'-এ সুজিমুরার লেখা প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে মাকিহারা—যিনি ২০২৪ সালে অল্প সময়ের জন্য জাপানের বিচারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন—'এক্স'-এ লিখেছেন যে, এই প্রকল্পের বিষয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাও সুজিমুরার মূল্যায়নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মাকিহারা বলেন, "ভারতের শিনকানসেন প্রকল্পটি এমন একটি বিষয় যার সঙ্গে আমি নিজেও যুক্ত ছিলাম। তবে আন্তর্জাতিক বৈঠক ও আলোচনার সময় ভারতীয় পক্ষের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ বারবার চোখে পড়েছে।" তিনি অভিযোগ করেন যে, ভারতীয় কর্তারা নিয়মিতভাবেই তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। জাপানের এই প্রাক্তন মন্ত্রী আরও বলেন, "পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, তাঁরা কোনওভাবেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। এমনকি কোনও প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁরা মুহূর্তের মধ্যেই তা থেকে সরে আসেন।"
মাকিহারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কেবল নিজেদের স্বার্থেই আলোচনার টেবিলে বসার অভিযোগও তোলেন। তিনি বলেন, "তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিতে থাকে। বিশেষ করে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীটির আচরণ ছিল অত্যন্ত বাজে। শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির মনোভাব যদি এমন হয়, তবে কোনও সুষ্ঠু লেনদেন বা আলোচনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যারা এই প্রকল্পে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন, সেই সব জাপানি মানুষের সম্মানের খাতিরেই আমাকে একথা বলতেই হচ্ছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রকল্পটি এগিয়ে না যাওয়ার পেছনে সম্পূর্ণ দায়ভার ভারতীয় পক্ষেরই।"
সুজিমুরার মতামত-ধর্মী প্রতিবেদনটির প্রসঙ্গ টেনে মাকিহারা উল্লেখ করেন যে, এমনকি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জুলাই ২০২৬-এর নয়াদিল্লি সফরও এই বিষয়ে কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
জাপান কেন এখন ভারতের শিনকানসেন প্রকল্প নিয়ে কথা বলছে?
দিল্লিতে বসবাসরত মেট্রো যান পরামর্শক সুজিমুরার লেখা একটি মতামত-ধর্মী প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই জাপানের প্রাক্তন মন্ত্রী মাকিহারার এই মন্তব্যটি উঠে আসে। যদিও ওই জাপানি ইঞ্জিনিয়র স্পষ্ট করেছেন যে মুম্বাই-আহমেদাবাদ প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর কোনও পেশাগত যোগ নেই, তবুও সুজিমুরা জানিয়েছেন যে তিনি প্রকল্পটির অগ্রগতি নজর রেখেছেন।