
মণিপুরে নতুন করে হিংসা ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত রাত ও আজ সকালের দুটি পৃথক ঘটনায় অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ইম্ফল পূর্ব জেলার খামেনলোক এলাকায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্দেহভাজন সশস্ত্র হামলাকারীদের গুলিতে তিন গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। অন্য একটি ঘটনায় গুলির আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ বছর বয়সি এক যুবক। পরপর এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পথে নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিক্ষোভকারীরা নিহতদের দেহ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে পৌঁছে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা নিহতদের দেহ নিয়ে ইম্ফলে মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিংয়ের বাসভবনের দিকে মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীদের একাংশ মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের নিরাপত্তাবলয় পেরিয়ে চত্বরে ঢুকে দেহ রেখে দেন বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। পরে কর্তৃপক্ষ দেহগুলি সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। এই ঘটনার জেরে ইম্ফল শহর ও আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। নতুন করে সংঘর্ষ ছড়ানোর আশঙ্কায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় বিধায়ক থোকচোম লোকেশ্বর সিংয়ের দাবি, ইম্ফল পূর্ব জেলা ও কুকি-অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন কয়েক জন গ্রামবাসী। সেই সময় তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পরিচয়ও সামনে এসেছে। তাঁরা হলেন ৩৫ বছর বয়সি অরুবাম রনিল, যিনি রনিন নামেও পরিচিত, ৪৪ বছর বয়সি লাইরেনলাকপাম ইনওবি এবং ৩২ বছর বয়সি ক্ষেত্রিমায়ুম সুশীল। আহত তিনজনের নাম মেইসনম সোমেন্দ্র (৫৫), বনসন খিংদ্রাম (৪৫) এবং নাংগোম সুরজ (২২)। তাঁদের ইম্ফলের রাজ মেডি সিটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট এলাকায় কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির উপস্থিতি রয়েছে। তবে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মণিপুরে হিংসার আরেকটি ঘটনা ঘটেছে মেইতেই ও পাঙ্গাল মুসলিম অধ্যুষিত একটি এলাকায়। সেখানে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান চলাকালীন পাথর ছোড়া ও গুলির ঘটনা ঘটে বলে জানা গিয়েছে। এর জেরে ভিড়ের মধ্যে থাকা বেশ কয়েকজন আহত হন। পরে গুলির আঘাতে ২৪ বছর বয়সি এক যুবকের মৃত্যু হয়। পরপর দুটি ঘটনায় রাজ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে তল্লাশি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।
হিংসার ঘটনায় আহতদের দেখতে রাজ মেডি সিটি হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং। অন্যদিকে, স্থানীয় বিধায়ক থোকচোম লোকেশ্বর সিং প্রশাসনের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, হামলার স্থানটির কাছে থাকা ‘সিনাই ক্যাম্প’ নামে পরিচিত সাসপেনশন অফ অপারেশনস (SoO) শিবিরটি সরিয়ে ফেলতে হবে। বিধায়কের বক্তব্য, আসাম রাইফেলসের সদস্যরা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে যাওয়া গ্রামবাসীদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে কীভাবে তাঁদের উপর হামলা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজ্যে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিভিন্ন সময়ে নতুন করে হিংসার ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। ইম্ফল পূর্ব ও কাংপোকপি জেলার সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল এলাকায় এই হামলার ঘটনা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, নতুন করে সংঘর্ষ ছড়ানো আটকানো, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখা।