
ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ বুধবার জানিয়েছেন যে, ভারত ও রাশিয়া যৌথভাবে ব্রহ্মস (BrahMos) মিসাইলের ছোট সংস্করণ এবং হাইপারসনিক সংস্করণ (শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ বা তারও বেশি দ্রুতগতির) তৈরির কাজ করছে। যা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী বা মাল্টি-ডোমেইন আঘাত হানার সক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করবে। আলিপভ উল্লেখ করেন, “ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার আরও আধুনিকীকরণের সম্ভাবনা অসীম। স্থল-ভিত্তিক মোতায়েনের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা নৌবাহিনী, সাবমেরিন ও বিমান-ভিত্তিক উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৭ সালের যুগান্তকারী পরীক্ষার পর ভারত কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ‘ট্রায়াড’ বা ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা অর্জন করে। এর ফলে এমন এক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যার আওতায় রয়েছে এই শ্রেণির বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য নির্ভুল আঘাত হানার (precision strike) সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।”
ব্রহ্মস মিসাইলের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দিল্লির থিংক-ট্যাঙ্ক ‘বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন’-এ তিনি এ কথা বলেন। আলিপভ বলেন, “বর্তমানে এর ছোট আকারের ও হাইপারসনিক সংস্করণ তৈরির কাজ চলছে, যা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী আঘাত হানার সক্ষমতাকে আরও জোরদার করবে। ব্রহ্মস একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা ভারতের জন্য রাশিয়ার স্বাভাবিক—এবং আমি বলব অপরিহার্য অংশীদার হওয়ার বিষয়টি জোরালভাবে পুনর্ব্যক্ত করে।” তিনি আরও বলেন, “ব্রহ্মস যৌথ উদ্যোগটি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ ও প্রকৃত পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা নীতিতে এক ধারণাগত পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে—প্রথাগত ক্রেতা-বিক্রেতা কাঠামোর পরিবর্তে প্রযুক্তি আদান-প্রদান, যৌথ উন্নয়ন ও যৌথ উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক নতুন ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। প্রায় দেড় দশক পরে, ভারত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর ব্যানারে এই পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।”
আলিপভ বলেন, “এই প্রকল্পটি আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে কাজ করেছে। এটি ভারতে সু-৩০ এমকেআই (Su-30MKI) যুদ্ধবিমান ও টি-৯০ (T-90) প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্কের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও স্থানীয় উৎপাদনের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের পথ সুগম করেছে; এমনকি অতি সম্প্রতি ‘ইন্দো-রাশিয়া রাইফেলস’ যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে একে-২০৩ (AK-203) রাইফেল উৎপাদনের বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত। সু-৫৭ (Su-57) প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যৌথভাবে তৈরি এবং এস-৪০০ (S-400) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনের মাধ্যমে এই সফল যাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সামগ্রিকভাবে, এটি ভারত-রাশিয়া সহযোগিতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে—যে সহযোগিতা প্রকৃত কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আমাদের মধ্যকার পূর্ণ আস্থা ও অবিচল বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র এখন বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় এর চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। পাশাপাশি 'অপারেশন সিন্দুর'-এর কথাও উল্লেখ না করলেই নয়। এই অভিযানে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র অসাধারণ কার্যকারিতা, নির্ভরযোগ্যতা ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছিল।"
ব্রহ্মস কী?
ব্রহ্মস হল ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি ক্রুজ মিসাইল প্রকল্প। এটি একটি সুপারসনিক মিসাইল হিসেবে পরিচিত, যার অর্থ হল এটি শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে চলতে সক্ষম। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস-এর তথ্যমতে, ভারতের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী এই মিসাইলটি ব্যবহার করে থাকে। এই মিসাইলটি স্থল, সমুদ্র, আকাশপথ এবং সাবমেরিন—সব জায়গা থেকেই ব্যবহারের উপযোগী করে নকশা করা হয়েছে। এর ফলে এটি ভারতের অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম বহুমুখী একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য সংস্করণটির পরীক্ষা ইতিমধ্যেই ভারতীয় বিমানবাহিনীর সুখোই-৩০ এমকেআই (Su-30MKI) যুদ্ধবিমান থেকে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নৌবাহিনী ও সাবমেরিন-ভিত্তিক সংস্করণগুলোও এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।
ছোট আকারের সংস্করণটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের জন্য ছোট আকারের ব্রহ্মস অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস জানিয়েছে যে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সংস্করণ—'ব্রহ্মস-এনজি' (BRAHMOS-NG)—কে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যা হবে আগের চেয়ে ছোট, হালকা, আরও স্মার্ট এবং রাডারে সহজে ধরা না পড়ার মতো (স্টেলথ) সক্ষমতাসম্পন্ন।
এ ধরনের নকশার ফলে মিসাইলটিকে আরও বেশি সংখ্যক বিমানে সহজে স্থাপন করা সম্ভব হবে এবং সশস্ত্র বাহিনী একটি প্ল্যাটফর্মে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক মিসাইল বহন করতে পারবে। এছাড়া এটি দ্রুত স্থানান্তর ও দ্রুত মোতায়েনের ক্ষেত্রেও সহায়তা করবে। সহজ কথায়, ছোট আকারের মিসাইল অনেকটা সুসংহত ও কম জায়গার মধ্যে অনেক কিছু ধরে রাখতে সক্ষম এমন একটি টুল-বক্সের মতো; এটি খুব বেশি জায়গা না নিয়েও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিকল্প বা সুবিধা দেবে।