
উজবেকিস্তানের তাসখন্দে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর সে দেশের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভ এক যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে যোগ দেন। সেখানেই মোদী ভারতের 'বিকশিত ভারত ২০৪৭' আর উজবেকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনা 'ইয়াঙ্গি ও'জবেকিস্তান'-এর মধ্যেকার মিলগুলো তুলে ধরেন। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে তরুণ প্রজন্ম, উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তিকে মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, "'ইয়াঙ্গি ও'জবেকিস্তান' (নতুন উজবেকিস্তান) আর 'বিকশিত ভারত ২০৪৭'—এই দুটো পরিকল্পনার কেন্দ্রেই রয়েছে তরুণ প্রজন্ম, উদ্ভাবন, সার্বিক উন্নয়ন আর আধুনিক প্রযুক্তি। ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, AI, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ক্লিন এনার্জি, মহাকাশ এবং পরমাণু শক্তির মতো ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে 'ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত' করে তুলছে। কৃষি আর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমাদের দুজনেরই শক্তি আছে, যা একে অপরের পরিপূরক। উজবেকিস্তানের উদ্যানপালনের অভিজ্ঞতা আর ভারতের আধুনিক কৃষি পদ্ধতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমরা খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারব।"
তিনি আরও বলেন, "উজবেকিস্তানের ভেষজ উদ্ভিদ আর ভারতের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের জ্ঞান—এটা একটা স্বাভাবিক মেলবন্ধন। আজ ঐতিহ্যবাহী ওষুধ নিয়ে যে চুক্তিগুলো সই হলো, তাতে আমাদের যৌথ প্রচেষ্টা আরও মজবুত হবে। আমরা চাই আমাদের এই পার্টনারশিপ শুধু দুই দেশের রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। তাই আমরা বিভিন্ন শহর আর রাজ্যের মধ্যেও পার্টনারশিপ তৈরি করছি। এর ফলে নগর পরিচালনা, শিল্প, শিক্ষা, পর্যটন আর সংস্কৃতির মতো ক্ষেত্রে সরাসরি যোগাযোগ বাড়বে।"
দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মোদী বলেন, "আমাদের দুই দেশের ঐতিহ্যই হলো সম্পর্কের গভীরতম শিকড়। উজবেকিস্তানে বৌদ্ধ হেরিটেজ সাইটগুলো রক্ষা করার জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করব। ছাত্রছাত্রী আর পেশাদারদের মধ্যে আদানপ্রদান বাড়ানো আমাদের কাছে একটা বড় অগ্রাধিকার। আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে উজবেকিস্তানে হিন্দি ভাষার প্রচারের জন্য স্কলারশিপ দেওয়া হবে।"
মোদী উজবেকিস্তানকে তাদের ৩৩তম স্বাধীনতা দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছাও জানান। তিনি বলেন, "ভারত-উজবেকিস্তান পার্টনারশিপ আরও মজবুত হলে তা মধ্য এশিয়ায় শান্তি, উন্নতি আর সমৃদ্ধির জন্য এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। মহামান্য, আপনাকে আরও একবার ধন্যবাদ। দু'দিন পরেই উজবেকিস্তান তার ৩৩তম স্বাধীনতা দিবস পালন করবে। ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে আমি আপনাকে এবং সকল নাগরিককে অভিনন্দন জানাই।"
৩০ দিনের ভিসা ফ্রি
রবিবার উজবেকিস্তান ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ৩০ দিনের ভিসা-ফ্রি ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভ বলেছেন, এই পদক্ষেপ দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, পর্যটন এবং ব্যবসায়িক আদানপ্রদান বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তাসখন্দে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকের সময় মির্জিয়োয়েভ এই ঘোষণা করেন। মোদী দু'দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে উজবেকিস্তানে গিয়েছেন।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভারতকে "নির্ভরযোগ্য কৌশলগত সঙ্গী" বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, যৌথ উদ্যোগ এবং যোগাযোগের কথাও তুলে ধরেন।
মির্জিয়োয়েভ বলেন, "ভারত আমাদের নির্ভরযোগ্য কৌশলগত সঙ্গী। গত বছর প্রথমবারের মতো আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যৌথ উদ্যোগের সংখ্যা সাতগুণ বেড়েছে। এখন আমাদের দুই দেশের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে ১৪টি সরাসরি ফ্লাইট চলে।"
তিনি দুই দেশের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক মজবুত করতে তাসখন্দের 'লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান কালচার' এবং 'তাসখন্দ স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ'-এ অবস্থিত 'মহাত্মা গান্ধী সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজ'-এর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জানান, সে দেশে যোগের দর্শন ও অভ্যাস ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ২০১৮ সাল থেকে সেখানে একটি বিশেষ যোগ ফেডারেশনও কাজ করছে। তিনি আরও বলেন যে এই বছর জুন মাসে সারা উজবেকিস্তান জুড়ে একটি যোগ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই দু'দিনের উজবেকিস্তান সফরের মূল লক্ষ্য হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো।
১৯৯২ সালের ১৮ মার্চ ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। স্বাধীনতার পর যে দেশগুলো উজবেকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, ভারত তাদের মধ্যে অন্যতম।