
পশ্চিম এশিয়ায় চলা দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জেরে যখন গোটা বিশ্বের শক্তির বাজার তোলপাড়, তখন ভারত সরকার এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের শীর্ষ কর্তারা অর্থনীতিকে বাঁচাতে জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য একটি "জাতীয় মিশন"-এর ডাক দিয়েছেন।
সোমবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে মন্ত্রীদের পঞ্চম অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর (IGoM) একটি বৈঠক হয়। সেখানে সামরিক স্তরের কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সামিল করার একটি রণকৌশল তৈরি করা হয়েছে, যা অনেকটা কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সত্ত্বেও, IGoM নিশ্চিত করেছে যে ভারতের শক্তি সুরক্ষা এই মুহূর্তে যথেষ্ট মজবুত। সরকার জানিয়েছে, দেশে যথেষ্ট পরিমাণে "রোলিং স্টক" বা মজুত ভান্ডার রয়েছে, যাতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, "IGoM-কে জানানো হয়েছে যে দেশ সুরক্ষিত এবং কোনও পেট্রোলিয়াম পণ্যের ঘাটতি নেই, যদিও বেশিরভাগ দেশ অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমাতে জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারতের কাছে ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল, ৬০ দিনের প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৪৫ দিনের এলপিজি-র রোলিং স্টক রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও ৭৩০ বিলিয়ন ডলারের স্বস্তিদায়ক জায়গায় রয়েছে। ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল শোধক এবং চতুর্থ বৃহত্তম পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিকারক দেশ, যা ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও পুরোপুরি মেটাচ্ছে।"
এই "সম্মিলিত প্রচেষ্টা"-র আর্থিক দিকটা বিশাল। সরকার পেট্রোল পাম্পে সাধারণ মানুষকে দামের আঁচ থেকে বাঁচিয়ে রাখলেও, এর পেছনের অর্থনৈতিক অঙ্কটা বেশ জটিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন সাধারণ মানুষকে এই উদ্যোগে সামিল হতে আবেদন করেছেন, তার কারণও এই আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সংকট, সাপ্লাই চেইন সমস্যা এবং মূল্যবৃদ্ধি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অত্যন্ত চড়া থাকায় দেশকে এক বিরাট বোঝা বহন করতে হচ্ছে। জ্বালানি সংরক্ষণ এই বোঝা কমাতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মোদী পেট্রোলিয়াম পণ্যের বিচক্ষণ ব্যবহার এবং অপচয় কমানোর উপর জোর দিয়েছেন, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতে দেশের উপর আর্থিক বোঝা কমে।"
তাছাড়া, ভারত এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে ৭০ দিন ধরে চলা সংঘাতের পরেও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা বিনামূল্যে আসছে না। এর জন্য তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে বিপুল ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে। ভারতীয় তেল বিপণন সংস্থাগুলি (OMCs) প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার লোকসান করছে, যাতে মূল্যস্ফীতির বোঝা সাধারণ মানুষের উপর না পড়ে।
২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকেই মোট ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থ পরিকাঠামো, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যখাতে খরচ করা যেত।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, "ভারত সেই কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি যেখানে এই অস্থিরতার সময়েও পেট্রোলিয়ামের দাম স্থিতিশীল রয়েছে, যদিও সংঘাত শুরু হওয়ার ৭০ দিনেরও বেশি হয়ে গেছে। অনেক দেশেই দাম ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু ভারতের তেল বিপণন সংস্থাগুলি প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা দৈনিক লোকসান বহন করছে, এবং ২০২৬-এর প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে, যাতে বিশ্ব বাজারের আকাশছোঁয়া দামের বোঝা ভারতীয় নাগরিকদের উপর না পড়ে। উদ্বেগের কোনও কারণ নেই এবং কোনও নাগরিকের রিটেল আউটলেটে ভিড় করারও প্রয়োজন নেই।"
প্রধানমন্ত্রীর "সম্মিলিত অংশগ্রহণ"-এর আবেদন আসলে দেশের আমদানি বিল কমানোরই একটি ডাক। একজন নাগরিক গাড়ি ভাগাভাগি করে বা গণপরিবহন ব্যবহার করে যে এক লিটার পেট্রোল বা ডিজেল বাঁচান, তা সরাসরি ৭৩০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে, সরকারের উপর ভর্তুকির বোঝা কমায় এবং অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য ডলারের চাহিদা কমিয়ে টাকার দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
২০২৬ সালের ১১ মে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে মেট্রো ও গণপরিবহন ব্যবহার করে, কার পুলিং করে পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানান। তিনি অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থেকে, দেশের মধ্যে পর্যটন ও উৎসব উদযাপন করে এবং এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা এড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণে সাহায্য করার কথা বলেন।
তিনি কৃষকদের রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমাতে, প্রাকৃতিক চাষের দিকে ঝুঁকতে, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে অনুরোধ করেন। কৃষিক্ষেত্রে ডিজেল পাম্পের পরিবর্তে সৌরচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার বাড়ানোরও পরামর্শ দেন।
রাজনাথ সিং বলেন, "জ্বালানি দক্ষতা, জনসচেতনতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের আচরণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মন্ত্রক ও রাজ্যগুলিকে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।" বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাসায়নিক ও সার মন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা; পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী; রেল, তথ্য ও সম্প্রচার, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব; সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু; অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী কিঞ্জারাপু রামমোহন নাইডু, বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল; এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ডঃ জিতেন্দ্র সিং।
তাঁদের জানানো হয় যে জনগণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের যথেষ্ট জোগান রয়েছে এবং বর্তমান সংরক্ষণ প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদী সংকট মোকাবিলার জন্য ক্ষমতা তৈরির উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভালো থাকায় মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার বা অতিরিক্ত জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য কেনার কোনও প্রয়োজন নেই।
IGoM স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বর্তমান সংরক্ষণ অভিযানের কারণ এই নয় যে তেলের ট্যাঙ্ক খালি, বরং কারণ হল তা ভরার খরচ ঐতিহাসিকভাবে অনেক বেশি। এখন "অপচয়মূলক ব্যবহার" কমিয়ে ভারত তার ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের ভান্ডারকে আরও বেশিদিন চালাতে পারবে, এবং আকাশছোঁয়া দামে নতুন করে তেল কিনতে হবে না।
কৃষকদের রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৫০% কমানোর অনুরোধ আমদানি নির্ভরতা কমানোর একটি দারুণ পদক্ষেপ। সার উৎপাদন ও আমদানি অত্যন্ত শক্তি-নির্ভর; প্রাকৃতিক চাষ এবং সৌর পাম্পের (যেমন পিএম-কুসুম যোজনা) দিকে এগোনো ভারতের খাদ্য সুরক্ষাকে পশ্চিম এশিয়ার তেলের অস্থিরতা থেকে মুক্ত করবে।
বৈঠকের পর এক্স-এ একটি পোস্টে রাজনাথ সিং সমস্ত অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি জনগণকে শান্ত থাকার এবং আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান, কারণ ঘাটতি বা সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত রোধে সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে বর্তমান পর্যায়ে ভারতের মূল লক্ষ্য হল শক্তির প্রবাহ যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত থাকে তা নিশ্চিত করা। তিনি সমস্ত পক্ষকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। রাজনাথ সিং ভারতের শক্তি মিশ্রণকে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার, পুনর্নবীকরণযোগ্য বিকল্প শক্তির উৎস দ্রুত প্রসারিত করার, আরও নির্ভরযোগ্য ও বৈচিত্র্যময় শক্তির সরবরাহ চিহ্নিত করার এবং শক্তি দক্ষতা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জরুরি প্রয়োজনের উপর জোর দেন। তিনি ভবিষ্যতের শক্তি সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত থেকে উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলার জন্য কৌশলগত রিজার্ভের প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান।