
মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে ইসলামাবাদকে পরমাণু হুমকি হিসেবে তুলে ধরার পরেই কড়া প্রতিক্রিয়া জানাল ভারত। বৃহস্পতিবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) জানিয়েছে, এই রিপোর্ট পাকিস্তানের "গোপন পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির ইতিহাস" থেকে তৈরি হওয়া ঝুঁকিকেই স্পষ্ট করে।
এদিন এক সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পাকিস্তানের ইতিহাস বরাবরই পরমাণু অস্ত্র নিয়ে গোপনীয়তায় ভরা। এই ধরনের রিপোর্ট আবারও তাদের ট্র্যাক রেকর্ড নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগকেই সত্যি প্রমাণ করে। জয়সওয়াল বলেন, "পাকিস্তানের একটা ইতিহাস আছে। তাদের গোপন পরমাণু কর্মসূচির ইতিহাস রয়েছে। আর এই ধরনের মন্তব্য আবার স্পষ্ট করে দেয় যে, তাদের এই গোপন কার্যকলাপের জন্য তারা বিশ্বের কাছে কতটা বড় হুমকি।"
গত ১৮ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের অফিস থেকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে রাশিয়া ও চিনের মতো বড় শক্তির সঙ্গে পাকিস্তানকেও আমেরিকার জন্য একটি বড় পরমাণু হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড '২০২৬ অ্যানুয়াল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট (ATA)' রিপোর্টটি পেশ করেন। এতে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি (IC) পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক অস্থিরতায় তার ভূমিকা এবং সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়গুলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক মিসাইল ডেলিভারি সিস্টেম নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ চালাচ্ছে। ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের অফিসের এই রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম।
সেনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্সের সামনে বার্ষিক "ওয়ার্ল্ডওয়াইড থ্রেটস" শুনানিতে তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষিত পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থা কৌশলগত হুমকির বিরুদ্ধে দেশকে সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। কিন্তু রাশিয়া, চিন, উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং পাকিস্তান বিভিন্ন ধরনের নতুন, অত্যাধুনিক বা প্রচলিত মিসাইল ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করছে, যা পরমাণু এবং সাধারণ পেলোড বহন করতে পারে এবং আমাদের দেশকে তাদের পাল্লার মধ্যে নিয়ে আসছে।"
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামপন্থী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ে পাকিস্তান এখনও একটি উদ্বেগের কারণ। আমেরিকা জানিয়েছে, আল-কায়েদা এবং আইএসআইএস ২০০০-এর দশকের শুরু এবং ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় এখন অনেক দুর্বল হলেও, আমেরিকা এখনও একটি জটিল এবং ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের মতাদর্শ প্রচার করতে এবং আমেরিকানদের ক্ষতি করতে চাইছে।
রিপোর্টে দক্ষিণ এশিয়ায় বাইরের চক্রান্তের মূল হুমকি হিসেবে আইএসআইএস-কে (ইসলামিক স্টেট - খোরাসান প্রদেশ)-কে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আইএসআইএস-কে জঙ্গিরা এই অঞ্চলে সক্রিয় এবং নিয়োগ ও পরিকল্পনার জন্য তারা এমন এলাকা ব্যবহার করছে যেখানে কোনও শাসন বা নজরদারি নেই। রিপোর্টে আরও বলা হয়, "২০২৫ সালে ইরাক, পাকিস্তান, সোমালিয়া এবং সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় প্রধান সন্ত্রাসবাদী নেতা ও জঙ্গিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আল-কায়েদা এবং আইএসআইএস-এর ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।"
এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জয়সওয়াল আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হানার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অসামরিক পরিকাঠামোতে হামলার নিন্দা করেন। তিনি বলেন, "আমরা আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলা দেখেছি। আমরা এই হামলার নিন্দা করছি কারণ এতে অসামরিক পরিকাঠামোকে নিশানা করা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের চরম দুর্দশা হয়েছে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে এই বিমান হামলার নিন্দা করছি।"
এর আগে মঙ্গলবার, কাবুলের ওমিদ অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে পাকিস্তানের 'বর্বর' বিমান হানার তীব্র নিন্দা করে ভারত। এই হামলায় শত শত মানুষ নিহত এবং অনেকে আহত হন। বিদেশ মন্ত্রকের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই অপরাধমূলক কাজের জন্য দোষীদের জবাবদিহি করার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং আফগানিস্তানের জনগণের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত ১৬ মার্চ রাতে কাবুলের ওমিদ অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে পাকিস্তানের বর্বর বিমান হানার তীব্র নিন্দা করছে। "এটি একটি কাপুরুষোচিত এবং বিবেকহীন হিংসার ঘটনা, যেখানে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে বহু অসামরিক মানুষের প্রাণ গেছে, যাকে কোনওভাবেই সামরিক লক্ষ্যবস্তু বলা যায় না। পাকিস্তান এখন একটি গণহত্যাকে সামরিক অভিযান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের এই জঘন্য আগ্রাসন আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের উপর নির্লজ্জ আক্রমণ এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি।
"এই হামলা পবিত্র রমজান মাসে চালানো হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য শান্তি, আত্মচিন্তা এবং ক্ষমার সময়। এই ঘটনা একে আরও নিন্দনীয় করে তুলেছে। এমন কোনও ধর্ম, আইন বা নৈতিকতা নেই যা একটি হাসপাতাল এবং তার রোগীদের উপর ইচ্ছাকৃত হামলাকে সমর্থন করতে পারে," বলা হয় বিবৃতিতে।
"ভারত শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে, আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে এবং এই দুঃখজনক মুহূর্তে আফগানিস্তানের জনগণের পাশে রয়েছে। আমরা আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি আমাদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি," যোগ করা হয় বিবৃতিতে।
টোলো নিউজের খবর অনুযায়ী, কাবুলের একটি নেশামুক্তি হাসপাতালে পাকিস্তানের এই মারাত্মক বিমান হামলায় ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। (এএনআই)