
ভারত ইতিমধ্যে আটবার রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) কাজ করেছে। ২০২৮-২৯ সালের জন্য ফের অস্থায়ী সদস্যপদের লড়াইয়ে নেমেছে তারা। তবে এর পাশাপাশি স্থায়ী আসনের পুরনো দাবিটাও নতুন করে উসকে দিয়েছে নয়াদিল্লি। ১৯৯৪ সালে ৪৯তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবার এই দাবি তোলা হয়েছিল। ভারতের এবারের প্রচারের স্লোগান হলো— “শান্তি: রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারত ২০২৮-২৯ - আদর্শ, বিশ্বাস, সততা” (Shanti: India for the United Nations Security Council 2028–29 - Norms, Trust, Integrity)।
১৯৪৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদ তৈরি হয়েছিল। দেখতে দেখতে ৮১ বছর কেটে গেলেও এর স্থায়ী সদস্যপদে কোনো বদল আসেনি। চিন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন এবং আমেরিকা—এই পাঁচটি দেশই স্থায়ী সদস্য, আর এদের প্রত্যেকের হাতেই রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। ভারতের যুক্তি, বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে এই পরিষদের পরিধি বাড়ানো ভীষণ জরুরি।
নয়াদিল্লি চাইছে স্থায়ী এবং অস্থায়ী—দুই ধরনের আসনই বাড়ানো হোক। তাদের মতে, শুধু অস্থায়ী আসন বাড়ালে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামোয় কোনো বদল আসবে না, ওই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের দাপটই থেকে যাবে। ১৯৬৫ সালে মাত্র একবারই এই পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১১ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করা হয়েছিল, যেখানে ৪টি অস্থায়ী আসন যোগ করা হয়।
ভারত নিজেদের বিশাল আকার, গণতান্ত্রিক কাঠামো, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরছে। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষায় তাদের বড় ভূমিকা এবং গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল দেশগুলোর) হয়ে কথা বলার বিষয়টিও সামনে আনছে। ভারতের স্পষ্ট কথা, এই সংস্কার আর ঝুলিয়ে রাখা যায় না।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের মিলেনিয়াম সামিটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ভারতের দাবি জোরালো করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, স্থায়ী সদস্যপদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো যোগ্যতা যে ভারতের আছে, সেটা তারা বেশ কয়েক বছর ধরেই বুঝিয়ে আসছে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রসংঘের প্রায় ৫০টি শান্তিরক্ষা মিশনে ভারত এযাবৎ প্রায় ৩ লক্ষ কর্মী পাঠিয়েছে। বর্তমানে ১০টি মিশনে ভারতের ৪,৩০০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন।
মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাকস বলেছেন, "গোটা বিশ্বের দিকে তাকালে ভারতের মতো আর কোনো দেশ নেই, যারা রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ষষ্ঠ স্থায়ী সদস্য হওয়ার এত জোরালো দাবিদার।"
পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চারটি দেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতকে সমর্থন করে আসছে। চিন সরাসরি সমর্থন না করলেও, সাম্প্রতিক ব্রিকস (BRICS) সামিট এবং অন্যান্য মঞ্চে তারা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সামিটে চিন ও রাশিয়া স্পষ্ট জানিয়েছে, রাষ্ট্রসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিল এবং ভারতের বড় ভূমিকা নেওয়ার ইচ্ছাকে তারা সমর্থন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে এই সংস্থাকে আরও গণতান্ত্রিক ও কার্যকর করার পক্ষেও সওয়াল করেছেন নেতারা।
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য দেশেরই একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু কোনো বড় সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কেবল পাঁচ স্থায়ী সদস্যের। রাষ্ট্রসংঘের সনদ অনুযায়ী, সব সদস্য দেশকে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। বাকিদের সমর্থন থাকলেও, মাত্র একটি ভেটো প্রয়োগ করে যেকোনো বড় প্রস্তাব আটকে দেওয়া যায়। ভারত যদি স্থায়ী আসন পায়, তবে তাদের হাতেও ভেটো ক্ষমতা আসবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বড় ইস্যুগুলোতে ভারতের প্রভাব অনেকটাই বাড়বে।
১৯৪৫ সালের ২৬ জুন রাষ্ট্রসংঘের সনদ সই হয় এবং ওই বছরের ২৪ অক্টোবর তা কার্যকর হয়। ১৯৪৬ সালের ১৭ জানুয়ারি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের চার্চ হাউসে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম বৈঠক বসে। প্রতি মাসে এর সভাপতিত্ব ঘোরে। বিশ্বে শান্তির ক্ষেত্রে কোনো হুমকি তৈরি হলে নিরাপত্তা পরিষদ তা খতিয়ে দেখে। তারা শান্তি ফেরানোর ডাক দেয়, প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে বা শক্তি প্রয়োগের অনুমতিও দিতে পারে।
সাধারণ পরিষদ দুই বছরের জন্য অস্থায়ী সদস্যদের বেছে নেয়। ভারত এর আগে ১৯৫০-৫১, ১৯৬৭-৬৮, ১৯৭২-৭৩, ১৯৭৭-৭৮, ১৯৮৪-৮৫, ১৯৯১-৯২, ২০১১-১২ এবং ২০২১-২২ সালে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে কাজ করেছে। এই সময়কালে তারা বিভিন্ন সংঘাত মেটানো, শান্তিরক্ষা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এখন ২০২৮-২৯ সালের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেছে নয়াদিল্লি।
বর্তমানে ২০২৬ সালের জন্য ডেনমার্ক, গ্রিস, পাকিস্তান, পানামা ও সোমালিয়া এবং ২০২৭ সালের জন্য বাহরিন, কলম্বিয়া, কঙ্গো, লাটভিয়া ও লাইবেরিয়া অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি অ্যালবানিজ জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের জন্য তারাও একটি অস্থায়ী আসনের লড়াইয়ে নামবে।
১৯৯২ সালে ৪৭তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবার নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো বদলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। এরপর ১৯৯৩ সালে 'ওপেন এন্ডেড ওয়ার্কিং গ্রুপ' তৈরি হয়। কিন্তু তারপর থেকে আকার, সম্প্রসারণের মডেল বা প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি। ২০০২ সালে মরিশাস, ভুটান, কিউবা, ডমিনিকান রিপাবলিক, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, সাইপ্রাস এবং কম্বোডিয়া—এই ৯টি দেশ ভারতের প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছিল। সম্প্রতি সাইপ্রাস ফের তাদের দৃঢ় সমর্থনের কথা জানিয়েছে এবং প্যালেস্টাইনও প্রকাশ্যে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে।