
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৃহস্পতিবার বলেছেন, 'অপারেশন সিঁদুর' সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের কড়া জবাবের প্রতিফলন এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় অঙ্গীকারের প্রমাণ। পহেলগাম জঙ্গি হামলার জবাবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর নির্ভুল ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে চালানো এই অপারেশনের এক বছর পূর্তিতে তিনি জওয়ানদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ একটি পোস্টে প্রধানমন্ত্রী মোদী লিখেছেন, "এক বছর আগে, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী #OperationSindoor-এর সময় অতুলনীয় সাহস, নির্ভুলতা এবং দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিল। যারা পহেলগামে নিরীহ ভারতীয়দের উপর হামলা করার সাহস দেখিয়েছিল, তাদের যোগ্য জবাব দেওয়া হয়েছিল। পুরো দেশ আমাদের জওয়ানদের বীরত্বের জন্য স্যালুট জানায়। অপারেশন সিঁদুর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের কঠোর জবাব এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রতি আমাদের অটল অঙ্গীকারের প্রতিফলন।"
পোস্টে তিনি আরও বলেন, "এই অপারেশন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব, প্রস্তুতি এবং সমন্বিত শক্তির প্রমাণ। একই সাথে, এটি আমাদের বাহিনীগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান যৌথতা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের আত্মনির্ভরতার যাত্রাকে তুলে ধরেছে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। আজ, এক বছর পরেও, আমরা সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করতে এবং এর মদতদাতাদের ধ্বংস করতে আগের মতোই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"
এদিকে, এই সামরিক অভিযানের বর্ষপূর্তিতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাহস ও বীরত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রধানমন্ত্রী মোদী X-এ তাঁর ডিসপ্লে পিকচার পরিবর্তন করে "অপারেশন সিঁদুর"-এর ছবি লাগিয়েছেন।
পহেলগাম জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিরীহ নাগরিকের মৃত্যুর পর, ২৫ মে, ২০২৫-এ 'অপারেশন সিঁদুর' শুরু হয়েছিল। এটি ছিল ভারতীয় সেনার তিনটি শাখার (স্থল, বায়ু ও নৌ) একযোগে চালানো একটি সুনির্দিষ্ট ও পেশাদার অভিযান।
এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিয়ন্ত্রণ রেখা (Line of Control) পেরিয়ে এবং পাকিস্তানের গভীরে থাকা জঙ্গি পরিকাঠামো ধ্বংস করা। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে মোট নয়টি প্রধান জঙ্গি শিবিরকে নিশানা করা হয়েছিল।
ভারতের এই পাল্টা হামলা পুরোটাই ছিল গোয়েন্দা তথ্যের উপর ভিত্তি করে এবং নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে চালানো। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি এড়িয়ে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছিল।
অপারেশন সিঁদুরের পর, পাকিস্তান ভারতের বিমানঘাঁটি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও UCAV (আনম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকল) দিয়ে একাধিক পাল্টা হামলার চেষ্টা করে। কিন্তু ভারতের মজবুত ও বহুস্তরীয় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সেই সমস্ত হামলা ব্যর্থ করে দেয়। এই সাফল্যের পিছনে ছিল ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজি (ICCS), যা রিয়েল-টাইমে বিপদ শনাক্ত করে তা নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করেছিল।
ভারতীয় বায়ুসেনা (IAF) পাকিস্তানের জঙ্গি পরিকাঠামোর উপর নিখুঁত হামলা চালিয়েছিল। নুর খান এবং রহিময়ার খান বিমানঘাঁটির মতো জায়গায় সফলভাবে এয়ার স্ট্রাইক করা হয়, যার প্রমাণও পরে প্রকাশ করা হয়। পাকিস্তানের ড্রোন ও ইউএভি হামলা থেকে ভারতের আকাশসীমা রক্ষা করতে বায়ুসেনার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আকাশ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম এবং পুরনো পেচোরা ও OSA-AK-এর মতো অস্ত্র কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়।
একই সময়ে, ভারতীয় স্থলসেনা আক্রমণাত্মক এবং আত্মরক্ষামূলক—দুই ভূমিকাতেই নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে। বায়ুসেনার সাথে তাল মিলিয়ে স্থলসেনার এয়ার ডিফেন্স ইউনিটগুলোও কাঁধে রেখে ছোড়ার মতো MANPADS থেকে শুরু করে দূরপাল্লার SAM (সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল) ব্যবহার করে। এই ইউনিটগুলো পাকিস্তানের পাঠানো ড্রোন এবং অন্যান্য বিস্ফোরক বোঝাই আকাশযানকে রুখে দিতে বড় ভূমিকা পালন করে।
অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারতীয় নৌসেনা সমুদ্রে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মিগ-২৯কে যুদ্ধবিমান এবং আগাম সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম হেলিকপ্টার দিয়ে সাজানো ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপ (CBG) মোতায়েন করা হয়। এর ফলে সমুদ্রপথে ক্রমাগত নজরদারি চালানো এবং যেকোনো বিপদ চিহ্নিত করা সহজ হয়। নৌসেনার এই উপস্থিতির কারণে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী তাদের পশ্চিম উপকূল বরাবর কার্যত আটকে পড়েছিল এবং কোনও অভিযান চালানোর সুযোগ পায়নি।
অপারেশন সিঁদুরের সময় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF) জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্বা জেলায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর একটি বড় অনুপ্রবেশের চেষ্টা রুখে দেয়। ভোরের দিকে সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে BSF জওয়ানরা দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, যার ফলে দু'পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। এই সংঘর্ষে BSF কমপক্ষে দুজন অনুপ্রবেশকারীকে খতম করে এবং তাদের কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। সুতরাং, অপারেশন সিঁদুর শুধুমাত্র একটি সামরিক সাফল্য ছিল না, এটি ছিল একটি কৌশলগত বার্তাও।