
বয়স নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া ও ব্যবহার করার অধিকার আসলে সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে এই রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের সাফ বার্তা, সুরক্ষার অজুহাতে শিশুদের সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট বা সমাজমাধ্যম ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করার চিন্তা অবাস্তব ও অযৌক্তিক। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের দুই সদস্যের বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, সংবিধানের ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার যে অধিকার দেওয়া রয়েছে, তার থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত হয়।
শিশুদের অনলাইন যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নমূলক কনটেন্ট (CSEAM) সংক্রান্ত একটি আবেদনের শুনানিতে বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।
শুনানি চলাকালীন আদালত বিচার করে দেখেছে, সুরক্ষার তাগিদে শিশুদের কি ইন্টারনেট ও সমাজমাধ্যম থেকে একবারে দূরে রাখা উচিত? এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব একবাক্যে খারিজ করে শীর্ষ আদালত। বেঞ্চের মন্তব্য,"শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের স্বাধীনতা,এই দুটি বিষয় একে অপরের বিরোধী নয়। দেশের শিশুরা একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, দুটিরই পাওয়ার সমান অধিকারী।"
বিচারপতিদের মতে, ইন্টারনেট হলো ভাবনার আদান-প্রদান, সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ এবং তথ্যের মুক্ত বাজার। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাহচর্য পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম এই ইন্টারনেট। তাই শিশুদের ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত করা মানে তাদের মুক্ত চিন্তার অধিকার কেড়ে নেওয়া। “ইন্টারনেটের জগতে শিশুদের উপস্থিতি অপরাধ নয়। সমস্যা প্রতিরোধে ভুক্তভোগী শিশুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে, ক্ষতিকারক কনটেন্ট তৈরি ও ছড়ানোর জন্য দায়ী প্ল্যাটফর্ম ও অপরাধীদের ওপর কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে।”এমন কথাই জানাল সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত স্বীকার করেছে যে, বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবস্থা শিশুদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কিন্তু তাই বলে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ব্যর্থতার দায় শিশুদের ওপর চাপিয়ে তাদের অফলাইনে রাখা 'ভুল পথে পদক্ষেপ' বলে মনে করে আদালত। দেশের শীর্ষ আদালতের মতে, কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার আটকানো যাবে না। উল্টে তারা ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক অন্ধকারে পা বাড়াবে, যেখানে ঝুঁকির পরিমাণ অনেকটাই বেশি। উপরন্তু, ঢালাও আইনি কড়াকড়ি থাকলে ইন্টারনেটে ব্ল্যাকমেল বা নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুরা বকা খাওয়ার ভয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার সাহস পাবে না। এই ধরনের ঢালাও নিষেধাজ্ঞাকে "প্রমাণহীন ও অপরিমিত পদক্ষেপ" বলে আখ্যা দিয়েছে আদালত।
তবে ডিজিটাল সুরক্ষার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়নি শীর্ষ আদালত। বয়সভিত্তিক ঢালাও নজরদারিতে সাধারণ মানুষের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা থাকে, তাই তার বদলে নির্দিষ্ট কিছু সুরক্ষাকবচের ওপর জোর দিয়েছে আদালত:
অভিভাবকদের নজরদারি:শিশুদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সম্মতি ও তত্ত্বাবধান জরুরি।
চাইল্ড মোড (Child Mode): শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষিত ‘চাইল্ড মোড’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে অ্যাকাউন্টগুলি বাই-ডিফল্ট 'প্রাইভেট' থাকবে।
যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা: অচেনা প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে মেসেজ বা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসার সুযোগ বন্ধ থাকবে এবং বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ক্ষতিকারক সাইটে নিষেধাজ্ঞা:কেন্দ্র সরকারের কাছে প্রাপ্তবয়স্কদের সাইট বা ক্ষতিকারক কনটেন্টে শিশুদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার পুরো স্বাধীনতা থাকছে।
এই সুরক্ষা কাঠামোর বিস্তারিত নিয়ম তৈরির দায়িত্ব কেন্দ্র সরকারের ওপরই ছেড়েছে শীর্ষ আদালত। উল্লেখ্য, 'জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স বনাম এস হরিশ' মামলায় অনুরাধা ভাসিন (২০২০) ও প্রজ্ঞা প্রসুন (২০২৫)-এর পূর্ববর্তী রায়কে ভিত্তি করেই এই তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি ইন্টারনেটে শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও চিহ্নিত করে তৎক্ষণাৎ মুছে ফেলার জন্য একটি সর্বভারতীয় জাতীয় তথ্যভাণ্ডার (National Database) গড়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।