
নির্দিষ্ট করে দেওয়া ফুটপাত দিয়ে হাঁটার অধিকার সংবিধানের আওতায় সুরক্ষিত একটি মৌলিক অধিকার। একটি মামলায় রায়ে জানাল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত অভিমত ব্যক্ত করেছে যে, রাস্তায় মোটরযানের চলাচলের চেয়ে এই অধিকারটি অধিকতর অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। শুক্রবার বিচারপতি পি এস নরসিমা এবং বিচারপতি এ এস চান্দুরকারের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, হাঁটার অধিকার সংবিধানের ১৯(১)(ডি) অনুচ্ছেদে নিশ্চিত স্বাধীনতারই একটি অংশ। এই অনুচ্ছেদটি ভারতের সমগ্র ভূখণ্ডে অবাধ চলাচলের অধিকার রক্ষা করে। এই অধিকারটিকে সংবিধানের ১৯(১)(এ), ১৯(১)(বি), ১৯(১)(সি) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (যা জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করে) সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
বেঞ্চ মন্তব্য করে, "যদি কোনও রাস্তা থাকে, তবে পথচারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফুটপাত চিহ্নিত ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্বও অবশ্যই থাকতে হবে। এটি একটি আইনত বলবৎযোগ্য দায়িত্ব।"
পাঁচ বছরের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণের মামলা থেকে এই রায়টি এসেছে। সকাল ৯টার দিকে বাবা যখন শিশুটিকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একটি ট্যাঙ্কার লরি পেছন থেকে শিশুটিকে ধাক্কা দেয় এবং তার কোমর ও শরীরের নীচের অংশ পিষে ফেলে। আঘাতের কারণে শিশুটি মারা যায়। ঘটনাস্থলে কোনও ফুটপাত বা পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা (পেডেস্ট্রিয়ান ক্রসিং) ছিল না।
সুপ্রিম কোর্ট শিশুটির বাবাকে প্রদেয় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে ১১,৪৪,৬২৮ টাকা নির্ধারণ করে এবং দুই মাসের মধ্যে তা পরিশোধের নির্দেশ দেয়। আদালত হাইকোর্টের একটি আদেশ বাতিল করে দেয়, যে আদেশে মূলত নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বেঞ্চ জানায়, "নির্দিষ্ট ফুটপাতে হাঁটার অধিকার লঙ্ঘিত হলে নাগরিকরা ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার পাওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এই প্রতিকার ব্যবস্থাটি 'মোটর ভেহিকেলস অ্যাক্ট, ১৯৮৮'-এর অধীনে প্রাপ্ত প্রতিকার ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।"
যেসব নাগরিকের নির্দিষ্ট ফুটপাতে হাঁটার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তারা ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার পাওয়ার জন্য দায়ী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই আইনি পথটি 'মোটর ভেহিকেলস অ্যাক্ট, ১৯৮৮'-এর অধীনে দাবিকৃত প্রতিকার থেকে আলাদা। বেঞ্চটি পর্যবেক্ষণ করে যে, নিরাপদ ও সুবিধাজনক ফুটপাতের অভাব এবং মোটরযানের চলাচলের কাছে ফুটপাতকে প্রায়শই গৌণ করে রাখার বিষয়টি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।
আদালত উল্লেখ করে যে, ভারতের শহর ও নগরগুলোর পরিকল্পনা প্রায়শই যানবাহন-কেন্দ্রিক করা হয়েছে, যার ফলে পথচারীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। আদালত পর্যালোচনা করে দেখেছে যে, কীভাবে নগরোন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যান্ত্রিক যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা গড়ে উঠেছে। আদালত উল্লেখ করেছে যে, চাকার আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করত এবং সংবিধানের ১৯(১)(ডি) অনুচ্ছেদের আওতায় চলাফেরার মৌলিক অধিকার বলতে মূলত পায়ে হেঁটে চলার অধিকারকেই বোঝায়। যানবাহন ব্যবহারের অনেক আগে থেকেই এই অধিকারের অস্তিত্ব রয়েছে এবং এর আওতায় নিরাপদ ও সুনির্দিষ্ট ফুটপাত ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা আবশ্যক।