
জনসমাবেশে বন্দে মাতরমের ৬টি স্তবক গাওয়াই বাধ্যতামূলক। কেন্দ্রের এই নিয়মের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। মঙ্গলবার এই মামলায় কেন্দ্রের জবাব চাইল শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ উঠেছিল মামলাটি। কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করছেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁকে পেপার বুক সংগ্রহ করে আগামী দু'সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রের জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ।
বন্দে মাতরম গাওয়ার এই নিয়মের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন জনপ্রিয় গায়ক টিএম কৃষ্ণা। তাঁর প্রশ্ন, কেন ৬টি স্তবকই গাইতে হবে? আর নতুন এই নিয়ম না মানলে কেন শাস্তির মুখে পড়তে হবে? গায়ক কৃষ্ণার হয়ে আদালতে সওয়াল করছেন প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর। তিনি বলেন, সংশোধিত এই আইনটি আদতে একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তাই ঠিক কী কী করলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, তা স্পষ্ট করে বলা উচিত। বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা ঠিক নয়।
শুনানিপর্বে মুরলীধর এবং তুষার মেহতার মধ্যে রীতিমতো উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে মুরলীধরের যুক্তির জবাব দিতে গিয়ে 'নকশাল' শব্দটি ব্যবহার করেন মেহতা। আর তাতেই বাধে বিপত্তি। এই শব্দের তীব্র প্রতিবাদ করেন মুরলীধর। সলিসিটর জেনারেলকে শব্দটি প্রত্যাহার করতে বলেন তিনি। মুরলীধর বলেন, "আপনি এইমাত্র যে শব্দটি ব্যবহার করলেন, তা প্রত্যাহার করুন। শুনানি লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে... আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।"
কিন্তু মেহতা তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। উলটে তিনি আবারও শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, "আমি বলেছি এটাই সাংবিধানিক পথ, নকশালরা যা চায় সেটা নয়। আর এর জন্য আমি মোটেও দুঃখিত নই।"
মেহতা ফের শব্দটি বলায় আবারও আপত্তি জানান মুরলীধর। ওড়িশা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বলেন, "উনি আবারও একই কথা বলছেন। আমি এবার কড়া প্রতিবাদ জানাচ্ছি... চিন্তা-ভাবনা করা মানেই নকশাল হয়ে যাওয়া নয়।"
এই তর্কাতর্কির মাঝেই হস্তক্ষেপ করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। তিনি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের কথা মনে করিয়ে দেন। বিচারপতি বলেন, সংবিধানে একজন অভিযুক্ত সন্ত্রাসবাদীরও কিছু অধিকার থাকে।
এরপর আদালত মূল আইনি বিষয়ের দিকে নজর দেয়। যারা বিবেকের তাড়নায় বন্দে মাতরম গাইতে চান না, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে 'বিজো ইমানুয়েল' মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পুরনো রায়ের কথা উল্লেখ করেন বিচারপতি বাগচী। তিনি বলেন, "আমরা আশা করব, বিজো ইমানুয়েল মামলায় এই আদালত যে রায় দিয়েছিল, সেটাই এই আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।"
বিচারপতি বাগচী আরও স্পষ্ট করে দেন যে, কেউ যদি বিবেকের কারণে বন্দে মাতরমের একটি বা সবকটি স্তবক গাইতে না চান, তবে শুধুমাত্র সেই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা উচিত নয়। আদালত জানায়, "অর্থাৎ, বিবেকের কারণে কেউ যদি জাতীয় স্তোত্রের একটি বা সবকটি স্তবক না গায়, তবে তাকে ফৌজদারি বিচারের মুখে পড়তে হবে না।"
মুরলীধর যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সংশোধিত আইনটি যেহেতু শাস্তিমূলক, তাই ঠিক কী করলে শাস্তি হতে পারে, তা আদালতের খতিয়ে দেখা দরকার। বেঞ্চ মেহতাকে পেপার বুক সংগ্রহ করতে বলে এবং আগামী দু'সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রকে তাদের জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রের জবাব পাওয়ার পর আদালত এই বিষয়টি নিয়ে ফের বিবেচনা করবে।