
একদিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে পরমাণু অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ওয়াশিংটনের সাহায্য! আমেরিকার এই নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ভারতে। পাকিস্তানের F-16 যুদ্ধবিমান আধুনিকীকরণের জন্য ৬৮৬ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৫৭০০ কোটি টাকা) প্যাকেজ অনুমোদন করেছে আমেরিকা। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মহলে। এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য পাকিস্তান বায়ুসেনার হাতে থাকা F-16 যুদ্ধবিমানগুলির আধুনিকীকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যক্ষমতা বাড়ানো। আমেরিকার এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সমালোচকদের প্রশ্ন, যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে, সেই দেশকেই কেন সামরিকভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করছে ওয়াশিংটন?
আমেরিকার প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা সংস্থা (DSCA)-র নথি অনুযায়ী, পাকিস্তানের জন্য প্রস্তাবিত এই সামরিক প্যাকেজের মোট মূল্য ৬৮৬ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রয়েছে ৯২টি Link-16 যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমান সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ক্রিপ্টোগ্রাফিক সরঞ্জাম, নেভিগেশন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। এই আধুনিকীকরণের ফলে পাকিস্তানের F-16 যুদ্ধবিমানগুলির যোগাযোগ, সমন্বয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে। পাশাপাশি বিমানগুলির পরিষেবা আয়ু ২০৪০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
আমেরিকার দাবি, এই প্যাকেজে কোনও পরমাণু অস্ত্র বা সরাসরি পরমাণু অস্ত্র ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি নেই। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উন্নত যোগাযোগ, নেভিগেশন এবং বিমানটির বেঁচে থাকার সক্ষমতা বাড়লে পাকিস্তানের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
এই চুক্তি ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে আমেরিকার আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে। একদিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের মতো পরমাণু অস্ত্রধারী দেশকে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে। সমালোচকদের বক্তব্য, আমেরিকার এই নীতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দ্বৈত অবস্থান তৈরি করছে। পাকিস্তানের F-16 যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা বাড়লে ভারতের সঙ্গে সামরিক ভারসাম্যেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
পাকিস্তানের F-16 কর্মসূচি নিয়ে ভারত আগেই ওয়াশিংটনের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত ২৮ অক্টোবর ফিলিপিন্সের সেবুতে ASEAN প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। সেই বৈঠকে পাকিস্তানকে আমেরিকার সামরিক সহায়তা নিয়ে আপত্তি জানান রাজনাথ। বিশেষ করে অত্যাধুনিক মার্কিন প্রযুক্তি পাকিস্তানের হাত ঘুরে অন্য কোনও দেশের কাছে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে ভারত। এই প্রসঙ্গে চিনের দিকেও ইঙ্গিত ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। রাজনাথের বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নেও দ্বিচারিতা না করার বার্তা উঠে আসে। ভারতের আশঙ্কা, পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের কারণে মার্কিন প্রযুক্তি অন্য দেশের হাতে পৌঁছনোর ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত নেভিগেশন এবং অ্যাভিওনিক্সের ফলে পাকিস্তানের F-16 যুদ্ধবিমানগুলি আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন বিমানের মধ্যে সমন্বয় এবং দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে সুবিধা পাবে পাকিস্তান। তবে এই প্যাকেজে সরাসরি পরমাণু অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে না। আমেরিকার সরকারি নথিতেও বলা হয়েছে, এই চুক্তির উদ্দেশ্য পাকিস্তানের F-16 বহরের রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকীকরণ এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সামরিক সমন্বয় বজায় রাখা। সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের F-16 আধুনিকীকরণে আমেরিকার ৫৭০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ভারত-আমেরিকা প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সামনে নতুন কূটনৈতিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন একদিকে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানকেও সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। এই দুই সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন আমেরিকার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।